জ্বালানি সঙ্কট উত্তরণে সরকার ৫ দফা বাস্তবায়ন করছে : সংসদকে প্রধানমন্ত্রী
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
দেশে বর্তমান জ্বালানি সঙ্কট উত্তরণে সরকার পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে সরকারের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানি নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানি সঙ্কট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এই কর্মপরিকল্পনাগুলো হচ্ছে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সাইসমিক জরিপ, বাপেক্স শক্তিশালীকরণ, প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট (পিএসসি) ও বিডিং এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ।
স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল সাড়ে ৩টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য আধঘণ্টা প্রশ্নোকাল পর্ব নির্ধারিত ছিল। এই পর্বে প্রধানমন্ত্রীর জন্য লিখিত আটটি প্রশ্ন ছিল। এই সময়ে চারটি লিখিত প্রশ্ন এবং ছয়টি সস্পূরক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
সেলিনা সুলতানার লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিনের জ্বালানি সঙ্কট উত্তরণে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন/ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ খনন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ১৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চলমান সাতটি কূপ খনন শেষ হলে আরো ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে চার হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং চার হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বাপেক্স শক্তিশালীকরণের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে আরো দু’টি নতুন রিগ ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পিএসসি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট) ও বিডিং : অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অফশোর এবং অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
এলএনজির অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোমে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সাথে নেগোসিয়েশন চলমান রয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৮ সালে এই টার্মিনাল হতে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি (গ্যাস) সরবরাহ করা সম্ভব হবে মর্মে আশা করছি। ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরো ৬০০ এমএমসিএফডি বৃদ্ধি পাবে। পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ২/১টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন হলে সামগ্রিকভাবে দেশে জ্বালানি সমস্যার সমাধান ও জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।
সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়াতে বর্তমান সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ গত ৬ জুন সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য অপরিহার্য পণ্যগুলো যেমন, সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ইত্যাদির ওপর আরোপনীয় সমুদয় কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং দুই শতাংশ অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর হতে শর্তসাপেক্ষে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন তাদের গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০.১৫ টাকা করে ক্রয় করবে। অর্থাৎ বাল্ক রেট এর অতিরিক্ত টাকা সরকার প্রণোদনা হিসেবে প্রদান করবে। ফলে গড়ে উৎপাদন মূল্য ৬-৭ টাকা প্রতি ইউনিট হিসেবে ৪৫ শতাংশ (৪০ শতাংশ মুনাফা ও ৫ শতাংশ প্রিমিয়াম) পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই সুবিধা পরবর্তী তিন বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে।
প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, দেশের সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ছাদে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। ওই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থাগুলোকে ইতোমধ্যে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ইতোমধ্যে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। সোলার ছাড়াও পানি বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি ওই কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে।
কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাত ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য সরকার আগামী ১০ বছর কী কী করবে সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে ইতোমধ্যে। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। যতটুকু আমার ধারণা আছে, দ্রুতই এই সংসদের সামনে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী উপস্থাপন করবেন সংসদের সামনে, দেশের সামনে। আগামী ১০ বছর কিভাবে আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সাজানোর চেষ্টা করছি। যাতে করে আমরা ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার টার্গেট করেছি সেটা আমরা অর্জন করতে সক্ষম হই।
সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এই সংসদের ফ্লোরে বসে আছি আমরা প্রত্যেকেই রাজনীতি করি এবং আমরা রাজনীতি করি এই দেশের জন্য, এই দেশের মানুষের জন্য। মাননীয় সংসদ সদস্য যে কনসার্নটি এক্সপ্রেস করেছেন অবশ্যই আমরা দেশে যেই সমস্যাটি আছে জ্বালানির এটিকে যে রকম আমরা সমাধান করতে চাইছি, আমাদের দেশে ফুলবাড়িয়াতে যে কয়লার কথা উনি বলেছেন সেই কয়লা পৃথিবীর যে সব সবচেয়ে ভালো কয়লা আছে তার মধ্যে একটি। কাজেই আমরা এই কয়লাটিকে উত্তোলন করে যদি আমাদের জ্বালানি সঙ্কট মেটাতে পারি অবশ্যই সেটা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা যে রকম সাশ্রয় করবে একইভাবে দেশের জন্য সেটি ভালো হবে। অবশ্যই কয়লাটি উত্তোলন করতে গেলে ওপেন পিট যদি করতে হয় স্বাভাবিকভাবেই সেখানে কিছু বসতবাড়ি আছে, সেখানে কৃষিজমি আছে। আমরা যেহেতু রাজনীতি করি দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য অবশ্যই সবচেয়ে আগে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কিভাবে সেই মানুষগুলোকে আগে সেটেলমেন্ট করা যায়। তাদের সেটেলমেন্টের ব্যবস্থা করে তাদের যাতে আয় রোজগার বন্ধ না হয় বরং সেই প্রকল্প গ্রহণ করলে সেই প্রকল্প থেকেও যাতে তারা কোনো না কোনো ভাবে বেনিফিট পেতে পারে সেই সব ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেই এবং অবশ্যই পরিবেশের যে বিষয়টি আছে সেটিকে গুরুত্ব দিয়েই আমরা যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।
ময়মনসিংহ-৬ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল হাসানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কটের কারণে ৯২টি বা এমনকি ২০০-৩০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, এমন প্রতিবেদন সঠিক নয়। যারা তথ্যের সূত্র ব্যবহার করেছিলেন, তারা পরের দিনই দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তাদের তথ্য সম্পূর্ণ ভুল ছিল। তিনি বলেন, প্রতিবেদনটিতে সম্ভবত ২০২২ সালের কোনো পুরনো সংবাদ বা তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে ওই প্রতিবেদন প্রত্যাহার করে দুঃখ প্রকাশ করা হয়।
কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য সরকার তাদের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান।
মনিরুল হক চৌধুরীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সব কওমি মাদরাসার সমন্বয়, উন্নয়ন ও পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ২০০৬ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ‘কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ’ নামে একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গঠন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ এর অধীন ‘কওমি মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রির (ইসলামিক স্টাডিস ও আরবি) সমমান প্রদান আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করে ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড গঠন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, গত ২৩ জুন ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (মাদরাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা, ২০২৬’ সংশোধনপূর্বক সহকারী মৌলভি (কারি) এবং ইবতেদায়ি কারি পদে নিয়োগের কাম্য যোগ্যতায় ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সনদকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। ওই দু’টি পদে কওমি মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) ডিগ্রিসহ ইলমে কিরাআত/হিফজুল কুরআন সনদ প্রাপ্তদের নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভুঁইয়ার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের যেটা রেগুলার সিলেবাস আছে সেটার মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। তবে অবশ্যই এটাকে আমরা আরো কিভাবে ডেভেলপ করা যায় নিশ্চয়ই সেটিকে পর্যালোচনা করতে পারি।
কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: মাহবুবুল আলম এই বিষয়ে সম্পূরক প্রশ্ন করলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি যদি আমাকে একটু আলাদা নোটিশ দেন আমি পুরো বিষয়টা সঠিকভাবে খোঁজখবর করে সংসদের সামনে উপস্থাপন করব।