বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি খোলা চিঠি

একটি সম্মিলিত নাগরিক আবেদন [প্রথম পর্ব]

Printed Edition

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

এই চিঠি শুধু একটি আবেদন নয়। এটি একটি প্রশ্নও।

বাংলাদেশ কি আবার পুরনো পথে হাঁটবে? সরকার বদলাবে। মুখ বদলাবে। কিন্তু রাষ্ট্র চালানোর পদ্ধতি একই থাকবে? নাকি জুলাইয়ের রক্ত, রাজনৈতিক ঐকমত্য আর গণভোটের রায়কে সামনে রেখে আমরা সত্যিই বদলাব?

আমরা দ্বিতীয় পথের কথা বলছি।

খবরে প্রকাশ, বিরোধী দল গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রোড মার্চ করবে। প্রশ্ন হলো- এই দাবির প্রয়োজন কেন হলো? আমরা চাই, আপনি বিষয়টি রাজনৈতিক চাল না ভেবে গভীরভাবে বিবেচনা করুন।

এই চিঠি কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে লেখা নয়। এখানে কোনো দলীয় স্বার্থ নেই। আছে শুধু দেশের প্রতি দায়বোধ। আর আপনার নেতৃত্বে একটি সত্যিকারের পরিবর্তন ও সাফল্য দেখার আকাক্সক্ষা।

চিঠিটি খোলা রাখছি এই কারণে- দেশের মানুষও যেন বিষয়টি জানতে ও বিচার করতে পারে। আমরা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলছি, যা ভালো মানুষকে কাজ করতে সাহায্য করে। আর খারাপ মানুষকে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে বাধা দেয়।

পুরনো খেলা, নতুন খেলোয়াড়

বাংলাদেশের বড় দলগুলো দীর্ঘদিন একটি বাস্তবতার কাছে নতি স্বীকার করে এসেছে। দল বড় রাখতে হলে ভালো-মন্দ সবাইকে সাথে নিতে হয়- এই বাস্তবতা।

কেউ চাঁদাবাজি করে দলে টেকে। কেউ পেশিশক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে। কেউ মিথ্যা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। কেউ যোগ্যতা ছাড়াই তোষামোদ করে জায়গা করে নেয়।

দল শক্তিশালী রাখতে এসব সহ্য করা হয়। স্বল্পমেয়াদে এটি কাজেও দেয়। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে এই সংস্কৃতিই সুশাসনের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই।

আপনার দলও এই সংস্কৃতির প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত- এমন দাবি সম্ভবত আপনি নিজেও করবেন না।

আমরা কাউকে বিব্রত করতে চাই না। কারো নাম ধরে অভিযোগ তুলতে চাই না। আমরা শুধু এমন একটি ব্যবস্থার কথা বলছি, যা ভালো মানুষকে রাজনীতিতে টিকিয়ে রাখে। আর অসৎ, সহিংস, সুবিধাবাদী রাজনীতিকে ধীরে ধীরে ছেঁটে ফেলে।

শুধু মুখ বদলালে সমাধান হয় না। আজ একজন চাঁদাবাজ গেলে, কাল আরেকজন তার জায়গা নেবে।

রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান না বদলালে এই চক্র থামবে না। শেখ হাসিনার শাসন আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে গেছে। দলীয় আনুগত্য যখন যোগ্যতা আর আইনের ওপরে ওঠে, তখন সরকার একদিন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

আপনার কী ক্ষতি?

এখানে একটি প্রশ্ন সরাসরি করা দরকার।

ভালো ব্যবস্থা- স্বাধীন বিচার, নিরপেক্ষ প্রশাসন, আইনের সমান প্রয়োগ- একজন সৎ শাসকের কী ক্ষতি করে?

কোনো ক্ষতি করে না। উল্টো, এটি তাকে রক্ষা করে।

বিচারব্যবস্থা বা প্রশাসনকে দলীয় করার দরকার কার? যার আইনের বাইরে গিয়ে কিছু আদায় করার প্রয়োজন আছে, শুধু তারই। একজন সৎ শাসকের সেই প্রয়োজন নেই।

তাহলে ভয় কিসের?

আইনের শাসন সবার জন্য সমান থাকলে শুধু বিরোধী দল নয়, সরকারও উপকৃত হয়। পুরো জাতি উপকৃত হয়। আর মানুষ একবার স্বাধীন বিচার আর নিরপেক্ষ প্রশাসনের স্বাদ পেলে, সহজে তা হারাতে চায় না।

এটিই একজন ভালো শাসকের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। এককথায়- এটি তার রাজনৈতিক জীবনবীমা।

ক্ষমতায় থাকলে এই ব্যবস্থা তাকে সঠিকভাবে দেশ চালাতে সাহায্য করে। ক্ষমতা ছাড়লে এই একই ব্যবস্থা তাকে অন্যায় ও প্রতিহিংসা থেকে রক্ষা করে।

তাই প্রশ্নটি সহজ। জনগণ যে সংস্কার চেয়েছে, দলগুলো যে সংস্কারে একমত হয়েছে, আর গণভোটে জনগণ যাকে সমর্থন দিয়েছে- সেই সংস্কার বাস্তবায়নে বাধা কোথায়?

আপনার নিজের অভিজ্ঞতাই তো প্রমাণ।

এই প্রশ্ন আপনার নিজের রাজনৈতিক জীবনের সাথেও জড়িত।

বিচারব্যবস্থা সত্যিই স্বাধীন থাকলে, আপনার মা- আমাদের প্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া- এবং আপনি নিজে কি শেখ হাসিনার প্রতিহিংসার শিকার হতেন?

এই প্রশ্নের উত্তরেই আমাদের ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে।

পুরনো ব্যবস্থা রেখে শুধু মানুষ বদলালে বিপদ থেকেই যায়। আজ নিজের পছন্দের বিচারক বসালে সাময়িক সুবিধা মিলবে। কিন্তু কাল অন্য কেউ ক্ষমতায় আসবে। সেও নিজের পছন্দের বিচারক বসাবে। অথবা আপনার বসানো বিচারককেই ব্যবহার করবে, যদি ব্যবস্থা একই থাকে। তখন এই একই অস্ত্র ব্যবহার হবে আপনার বা আপনার দলের বিরুদ্ধে। তাই কথা সহজ। শুধু মানুষ বদলালে হবে না। ব্যবস্থা বদলাতে হবে। এমন ব্যবস্থা গড়তে হবে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী চাইলেও বিচারব্যবস্থাকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারবেন না। আজকের প্রধানমন্ত্রীও না। আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রীও না। এটাই সবার নিরাপত্তা।

আরেকটি সত্য বুঝতে হবে- আপনি যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, আপনার সরকারের বৈধ নীতি ও সিদ্ধান্ত প্রশাসন এমনিতেই বাস্তবায়ন করবে। তাই প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বেআইনিভাবে দলীয় লোক বসানো বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেয়ার কোনো দরকার নেই।

বরং প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আইন, নিরপেক্ষতা ও সুনির্দিষ্ট নিয়মে এবং দক্ষতার সাথে চলে- এটা নিশ্চিত করতে পারলেই সেটা হবে আপনার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য। এভাবে শক্ত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হলে ভবিষ্যতে কোনো সরকারই সহজে তা ভাঙতে সাহস পাবে না। আর কেউ ভাঙতে চাইলে জনগণও বুঝে যাবে যে সে নিজের দলের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করতে চাইছে।

কিন্তু আপনি নিজে যদি বেআইনি দলীয়করণের পথ খুলে দেন, তাহলে পরের সরকারও সেই একই পথে হাঁটবে। তারাও নিজেদের লোক বসাবে, আর আপনার ও আপনার দলের অধিকার নষ্ট করতে সেই একই প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করবে।

তাই আজকের সাময়িক সুবিধা নয়- দরকার এমন স্থায়ী ব্যবস্থা, যা ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, সবার অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা করবে।

নেতার সবচেয়ে বড় শত্রু চাটুকার

আরেকটি বিপদ আছে। ক্ষমতার চার পাশে সবসময় কিছু চাটুকার আর স্বার্থান্বেষী মানুষ জড়ো হয়। তারা নেতা যা শুনতে চান, তা-ই বলেন। অপ্রিয় সত্য বলেন না। সমস্যা আড়াল করেন।

একসময় নেতা এই কয়েকজনের কথাকেই দেশের মানুষের মতো ভাবতে শুরু করেন। তখন তিনি বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যান। কোন সিদ্ধান্ত ভালো, আর কোনটি বিপদ ডেকে আনছে- তা বুঝতে পারেন না। ইতিহাসে এর প্রমাণ ভূরি ভূরি। শেখ হাসিনার পরিণতিও আমাদের চোখের সামনে।

তাই একজন নেতার আসল শক্তি চাটুকারদের ভিড়ে নয়। তার শক্তি এমন প্রতিষ্ঠান গড়ায়, যা প্রয়োজনে তাকেও সত্য কথা বলার সাহস রাখে।

জুলাই আপনাকে একটি সুযোগ দিয়েছে

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা শুধু সরকার বদলের জন্য রক্ত দেয়নি। তারা রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে চেয়েছিল। প্রতিহিংসার বদলে ন্যায়বিচার। দলীয় দখলের বদলে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। চাঁদাবাজির বদলে আইন। অযোগ্যতার বদলে যোগ্যতা। আর বেপরোয়া ক্ষমতার বদলে জবাবদিহি।

আজ আপনার সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। আপনি চাইলে পুরনো ব্যবস্থার আরেকজন উত্তরাধিকারী হতে পারেন। আবার চাইলে ব্যবস্থাটিকেই বদলে দিতে পারেন। দ্বিতীয় পথ কঠিন নয়। শুধু সাহস, দূরদৃষ্টি আর আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ব্যবস্থা রেখে যাওয়ার সৎ ইচ্ছা লাগবে। এটি করতে পারলে ইতিহাসে আপনার জায়গা হবে স্মরণীয়।

শুরুটা কোথা থেকে?

নতুন পরিকল্পনার দরকার নেই। আপনি নিজেই বলেছিলেন, “ও যধাব ধ ঢ়ষধহ.” সেই পরিকল্পনা নিয়ে অনেকের আগ্রহ আছে। হয়তো কোনো সঙ্গত কারণে আপনি এখনই তা প্রকাশ করছেন না। তবে আপাতত সেই পরিকল্পনা জানারও দরকার নেই।

রাষ্ট্র সংস্কারে নতুন করে চাকা আবিষ্কারের প্রয়োজন নেই। জনগণ ইতোমধ্যে একটি পথে সম্মত হয়েছে। সেটি জুলাই সনদ। সেটিই হোক আপনার এখনকার জরুরি কর্মপরিকল্পনা।

এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। দলগুলো অনেক বিষয়ে একমত হয়েছে। জনগণও গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। তাহলে সেই পথেই এগোন।

সব কাজ একসাথে নয়। একটি একটি করে শুরু করুন। অগ্রাধিকার ঠিক করুন। সময়সীমা দিন।

প্রতি মাসে জনগণকে জানান, সনদের কোন কাজ শুরু হয়েছে, কতটা এগিয়েছে, কোথায় বাধা এসেছে আর বাকি কাজ কবে হবে।

আমরা এখানে ছয় মাসের একটি পরিকল্পনা দিচ্ছি, জুলাই সনদের ভিত্তিতে। ছয় মাসে সব সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু ছয় মাসেই মানুষ বুঝে যাবে- দেশ কোন পথে যাচ্ছে।

প্রথম কাজ : বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা

আমাদের এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে প্রথম মাসেই একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ প্রকাশ করা সম্ভব। সব সমস্যা ৩০ দিনে মিটবে না। কিন্তু কাজ শুরু হয়েছে- এটুকু মানুষকে দেখাতে হবে।

বিচারক নিয়োগ স্বাধীনভাবে কিভাবে হবে? বিচার প্রশাসন কিভাবে স্বাধীন হবে? অধস্তন আদালত নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত হবে কিভাবে? কোন আইন সংসদে আসবে? কোন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নেবে? ফল কবে দেখা যাবে?

এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দরকার।

দুঃখজনক বিষয়, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আর স্বচ্ছ বিচারক নিয়োগের জন্য দু’টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল আপনার সরকার সেগুলো বাতিল করেছে।

এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। কেন বাতিল হলো? এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প কি আসছে? থাকলে তা জনগণের সামনে আনুন। সময়সীমা দিন। আর ভালো বিকল্প না থাকলে, পুরনো ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দ্রুত উদ্যোগ নিন।

প্রথম ৩০ দিনে যা দেখা যেতে পারে :

  • জুলাই সনদের বিচারবিভাগীয় অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন সূচি প্রকাশ
  • স্বাধীন বিচারক নিয়োগের আইনি কাঠামোর সময়সীমা
  • স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের রোডম্যাপ
  • বিচারক নিয়োগে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার নিয়ম প্রকাশ
  • প্রতি মাসে অগ্রগতির হিসাব

একই সাথে মানুষের নিত্যদিনের কষ্টেও হাত দিন

রাষ্ট্র সংস্কারের কথা মানুষ তখনই বেশি বিশ্বাস করবে, যখন তার সুফল নিজের সংসারেও দেখতে পাবে।

তাই প্রথম মাসেই আরেকটি কাজ শুরু করা যায়- ডিজিটাল বাজার ও জ্বালানি তদারকি।

চাল, তেল, পেঁয়াজ, চিনি, ডালের দাম হঠাৎ বাড়ে। কখনো গ্যাস বা জ্বালানির সঙ্কট হয়। মানুষ লাইনে দাঁড়ায়। তারপর সরকার ব্যবস্থা নেয়- এই বলা হয়।

প্রশ্ন হলো, সমস্যা হওয়ার আগেই সরকার কেন সঙ্কেত পায় না? কত পণ্য আমদানি হলো? কত মজুদ আছে? কোন গুদামে? কোথায় সরবরাহ কমছে? কোন ডিপোতে কত জ্বালানি? এই তথ্য সময়মতো হাতে থাকলে কৃত্রিম সঙ্কট আর অস্বাভাবিক মজুদ অনেক আগেই ধরা পড়ে।

সরকার ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের বাজার পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থার কথা বলেছে। ঘোষিত সেই উদ্যোগটিকেই দ্রুত সীমিত পরিসরে বাস্তবায়ন করা যায়। এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে আজকের জ্বালানি সঙ্কট অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হতো। কোথায় মজুদ কমছে, কোথায় চাহিদা বাড়ছে এবং কোথায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে- তার সঙ্কেত সরকার অনেক আগেই পেত। সঙ্কট তীব্র হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেয়া যেত। “আধুনিক রাষ্ট্রের কাজ সঙ্কট দেখা দেওয়ার পর দৌড়ানো নয়; সঙ্কট আসার আগেই তার সঙ্কেত ধরা।

আমাদের প্রস্তাব- ছোট করে হলেও কাজ শুরু হোক। সারা দেশে নয়, ঢাকা বা কয়েকটি বড় শহর দিয়ে শুরু হোক। কয়েকটি জরুরি পণ্য আর জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে শুরু হোক। বড় আমদানিকারক, পাইকার, পরিবেশক আর গুরুত্বপূর্ণ গুদামের তথ্য একটি ডিজিটাল ব্যবস্থায় আসুক।

ব্যাংকে এলসি খোলা থেকে শুরু করে আমদানিকারকের তথ্য, বন্দরে পণ্য খালাস, কোন জাহাজ পণ্য খালাসের জন্য বন্দরে ভিড়তে পারছে না এবং কেন, পণ্য কার গুদামে যাচ্ছে এবং কাস্টমসের তথ্য- সবকিছু একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় একে-অপরের সাথে মিলতে হবে। দপ্তরে দপ্তরে তথ্য মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা থাকলে ভুল তথ্য দিলেই তা সিস্টেমে ধরা পড়বে। সতর্ক বার্তা যাবে। আর অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

পাইলট প্রকল্প স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন হোক। কাজ করলে ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়ানো হোক।

এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি থামবে না। কিন্তু কৃত্রিম সঙ্কট, গোপন মজুদ আর সম্ভাব্য ঘাটতি দ্রুত ধরা পড়বে।

তথ্যের সাথে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতাও থাকতে হবে। কার দায়িত্ব কী, তা স্পষ্ট থাকতে হবে। কত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে, তা-ও স্পষ্ট থাকতে হবে। ভুল হলে কে জবাব দেবে, তা-ও। আর এই ব্যবস্থা কোনো মন্ত্রীর বা সরকারের ব্যক্তিগত প্রকল্প হওয়া উচিত নয়। আইন আর প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে দাঁড় করাতে হবে। তাহলে সরকার বদলালেও ব্যবস্থা টিকে থাকবে।

শেষ কথা

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

এই চিঠিতে আমরা প্রথম মাসের জন্য দু’টি কাজের কথা বললাম।

প্রথমটি. বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার দৃশ্যমান সূচনা। দ্বিতীয়টি. ডিজিটাল বাজার ও জ্বালানি তদারকির সীমিত পাইলট। একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ভিত শক্ত করবে। অন্যটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরকারকে আগেভাগে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা দেবে।

কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রশ্নটি রাজনৈতিক। আমরা শুরুতে যে প্রশ্ন করেছিলাম, তার উত্তর এখন পরিষ্কার। ভালো ব্যবস্থা একজন সৎ শাসকের কোনো ক্ষতি করে না। বরং তাকে রক্ষা করে। আপনার সামনে সুযোগ আছে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ার, যা শুধু আপনার সরকারকে নয়, ভবিষ্যতের বাংলাদেশকেও রক্ষা করবে। ক্ষমতায় থাকলে এটি আপনাকে সাহায্য করবে। ক্ষমতার বাইরে গেলে এটি আপনাকে রক্ষা করবে। এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক জীবনবীমা আর কী হতে পারে?

মানুষ যদি দেখে, আপনার নিজের দলও আইনের ঊর্ধ্বে নয়-তাহলে সেটিই হবে আপনার প্রতি মানুষের আস্থার সবচেয়ে বড় ভিত্তি। আর একবার মানুষ ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থার সুফল পেলে, তারা তা সহজে হারাতে দেবে না। ভবিষ্যতে কেউ এই ব্যবস্থা নষ্ট করার সাহস পাবে না। আপনি বহু বছর যুক্তরাজ্যে ছিলেন। সেখানে সরকার বদলায়, কিন্তু স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কোনো সরকার ইচ্ছামতো বদলে দিতে পারে না। ঘঐঝ-এর মতো জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থাও একবার মানুষের আস্থা অর্জন করলে সহজে তুলে দেয়া যায় না। ভালো ব্যবস্থা এভাবেই টিকে থাকে- আইনে, প্রতিষ্ঠানে এবং মানুষের সমর্থনে।

আমাদের আবেদন কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারকে দুর্বল করার জন্য নয়। আমাদের আবেদন এই- এমন একটি রাষ্ট্র গড়ুন, যেখানে ভালো মানুষ ভালোভাবে দেশ চালাতে পারে। আর খারাপ মানুষ চাইলেও রাষ্ট্রকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে।

পরবর্তী পর্বে আমরা তুলে ধরব স্বাধীন পুলিশ কমিশন, কার্যকর মানবাধিকার কমিশন, আর আগামী মাসগুলোর আরো কিছু বাস্তব সংস্কার প্রস্তাব।

বিনীত,

স্বাক্ষরকারীগণ

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। আহ্বায়ক, আধিপত্যবাদ বিরোধী নাগরিক সমাজ।

মোহাম্মদ হাসান নাসির - বনানী, ঢাকা ১২১৩, বাংলাদেশ এনডিজে (ঘউঔ)

সাকিব আলী, সাবেক কূটনীতিক, ঢাকা বাংলাদেশ।

মহিউদ্দিন আহমেদ ( লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, টরন্টো, কানাডা)

মো: ফেরদৌস আজিজ - ঢাকা, বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা

মোহাম্মদ ওয়ালিউদ্দিন তানভীর - লিডস, যুক্তরাজ্য

সাফির উদ্দিন - ডালাস, টেক্সাস ও যুক্তরাষ্ট্র। চিকিৎসক ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল কনসালট্যান্ট

মাহবুবুর রব চৌধুরী- টরন্টো, কানাডা। সাবেক সভাপতি, টরন্টো বাংলাদেশ সমিতি। সিনিয়র কলামিস্ট, সাপ্তাহিক ভোরের আলো, টরন্টো, কানাডা। -বিজ্ঞাপন