দেড় দশকের ব্যাংক লুটপাটে ভয়াবহ প্রভাব খেলাপি ঋণে

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition
  • ছাড়ের পর ছাড়, তবু লাগামহীন অনাদায়ী ঋণ
  • ৬ মাসে বেড়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা

আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের ব্যাংক খাতের লুটপাটের চিত্র এখন খেলাপি ঋণ হিসেবে বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। একমাত্র বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমই ব্যাংক খাত থেকে বের করে নিয়েছিল সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা। প্রায় অর্ধশতাধিক অলিগার্ক গড়ে উঠেছিল যারা ব্যাংক খাত থেকে জনগণের আমানতের অর্থ ব্যাংক দখল করে বের করে নিয়েছিল। কিন্তু ওইসব অর্থ আর ফেরত দেয়া হচ্ছে না। ওইসব ঋণ এখন ব্যাংকিং খাতে গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত দুই বছরে ছাড়ের পর ছাড় দেয়া হচ্ছে, তবু কমছে না খেলাপি ঋণ। বরং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় আরো বড় হচ্ছে। গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, জুন শেষে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণস্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি। অর্থাৎ ব্যাংকের বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের প্রায় ৩৩ টাকা এখন আর নিয়মিত নেই। খেলাপি ঋণ কমাতে গত কয়েক বছরে ঋণগ্রহীতাদের জন্য একের পর এক সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, বিশেষ এক্সিট- সব পথই খোলা হয়েছে। কমানো হয়েছে ডাউন পেমেন্টের চাপ, বাড়ানো হয়েছে ঋণ পরিশোধের সময়, দেয়া হয়েছে গ্রেস পিরিয়ডের সুযোগ। এর পরও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি থামছে না।

সমস্যাগ্রস্ত ঋণ আদায়যোগ্য করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নীতিগত হাতিয়ার হলো পুনঃতফসিল। নির্দিষ্ট শর্তে খেলাপি ঋণকে নতুন মেয়াদ ও কিস্তি নির্ধারণ করে নিয়মিত করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালের বিশেষ নীতিমালায় ৩০ জুন পর্যন্ত শ্রেণিকৃত ঋণ সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর গ্রেস পিরিয়ড রাখার সুযোগও দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছাড় ছিল মাত্র ২ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিলের সুযোগ। একই ঋণ আগে তিন বা তার বেশি বার পুনঃতফসিল হয়ে থাকলে অতিরিক্ত ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের শর্ত রাখা হয়। পুনঃতফসিল করা ঋণের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা বিবেচনায় সুদের হার নির্ধারণ এবং মাসিক বা ত্রৈমাসিক কিস্তিতে টাকা পরিশোধের সুযোগও রাখা হয়েছে। শুধু খেলাপি ঋণ নয়, আর্থিক সঙ্কটে থাকা কিছু নিয়মিত ঋণও পুনর্গঠনের সুযোগ পাচ্ছে। ব্যবসা সাময়িকভাবে সঙ্কটে পড়লেও ভবিষ্যতে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আছে- এমন ঋণগ্রহীতাদের জন্য মেয়াদ বাড়ানো, কিস্তি পুনর্নির্ধারণ ও অন্যান্য শর্ত শিথিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি, সব সমস্যাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাকে এক কাতারে না ফেলে যাদের ব্যবসা সচল এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আছে, তাদের সুযোগ দিলে ব্যাংকের পাওনা আদায়ের সম্ভাবনাও বাড়বে।

খেলাপি ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য রয়েছে বিশেষ এক্সিট বা ওয়ান টাইম এক্সিট সুবিধা। এ ব্যবস্থায় ঋণগ্রহীতাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ অর্থ পরিশোধ করে পুরো ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ দেয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালের নির্দেশনায় এককালীন এক্সিট সুবিধা নিতে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্টের শর্ত রাখা হয়। ব্যাংককে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির নির্দেশও দেয়া হয়েছে। এই সুবিধা নেয়ার পর একই ঋণ আবার পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের সুযোগ না রাখার বিধান রয়েছে। নীতিগত সুবিধা নেয়ার সময়সীমাও একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ নীতিগত সহায়তার জন্য আবেদন করার সময়সীমা আরো ছয় মাস বাড়িয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত করে। নতুন নির্দেশনায় নির্দিষ্ট শর্তে আনক্লাসিফায়েড ঋণের পুনর্গঠন এবং শ্রেণিকৃত ঋণের বিশেষ পুনঃতফসিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য দরজা এখনো পুরোপুরি বন্ধ করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ দিকে এত সুবিধার পরও প্রশ্ন উঠেছে- ছাড় কি খেলাপি ঋণ কমাচ্ছে, নাকি শুধু সমস্যাকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেই এর একটি ইঙ্গিত মিলছে। ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এক বছরে পুনঃতফসিল করা ঋণ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত ব্যবসায়ী সাময়িক সঙ্কটে পড়ে খেলাপি হলে তাকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়া যৌক্তিক। কিন্তু ইচ্ছাকৃত খেলাপি, জালিয়াতি বা অনিয়মের মাধ্যমে নেয়া ঋণের ক্ষেত্রে একই ধরনের ছাড় দিলে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি আরো দুর্বল হতে পারে।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হলো দীর্ঘ দিনের অনিয়ম ও ঋণের প্রকৃত মান নতুন করে নির্ধারণ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে ব্যাংকিং খাত ছিল লুটপাটের প্রধান স্থান। একমাত্র ব্যাংক ডাকাত নামে পরিচিত এস আলমই ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে নিয়েছে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা। এর বাইরে নাসা, বেক্সিমকো, সামিট, এনন টেক্স, শিকদার গ্রুপসহ বহু অলিগার্ক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে পানির মতো বের করে নিয়েছে সাধারণের আমানত। কিন্তু ওইসব অর্থ এখন আর ফেরত দিচ্ছে না। এসব ঋণ এখন ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে জুন শেষে ছয় লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণকে শুধু নতুন ঋণখেলাপির ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অতীতের অনিয়মের দায়ও এর মধ্যে রয়েছে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে এখন নীতিগত ছাড়ের পাশাপাশি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ, ঋণ বিতরণে যাচাই-বাছাই, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে শুধু পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করে সঙ্কটের সমাধান হবে না। কারণ, একবার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে নিয়মিত দেখানো গেলেও ঋণগ্রহীতা যদি শেষ পর্যন্ত টাকা পরিশোধ না করেন, তাহলে কয়েক বছর পর একই ঋণ আবার খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ছয় মাসে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ার এই চিত্র তাই ব্যাংক খাতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। ছাড়ের সুযোগ কতটা দেয়া হবে- তার চেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, ছাড় পাওয়ার পর ঋণগ্রহীতা সত্যিই টাকা ফেরত দিচ্ছেন কি না।