১১ মাসে দেশে ৮৫২ রাজনৈতিক সহিংসতা
আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখল নিয়ে অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
Printed Edition
- এইচআরএসএস’র মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন
- নিহত ১২৯ আহত ৬৯৬৬ জন
চলতি বছরের ১১ মাসে দেশে কমপক্ষে ৮৫২টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১২৯ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬৯৬৬ জন। ২৯৩টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৪২০ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। কমপক্ষে ১৯০৯ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৭৮৯ জন। এ ছাড়া সীমান্তে ৬৯টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে ২৪ জন বাংলাদেশী নিহত, ৩৮ জন আহত ও ৬০ জন গ্রেফতার হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতির এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। রিপোর্টে বলা হয়, গুম ও ক্রসফায়ারের মতো ঘটনা না ঘটলেও রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণ, মাজারে হামলা ও ভাঙচুর এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনে মৃত্যু, শ্রমিকদের ওপর হামলা, শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, কারাগারে মৃত্যু, সভা-সমাবেশে বাধা প্রদানের ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাসহ বেশ কিছু সামাজিক অপরাধ ঘটেছে, যা জনমনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখল নিয়ে অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতার ৮৫২টি ঘটনার মধ্যে বিএনপি ও তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তর্কোন্দলে ৪৭৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪৫৭৭ জন ও নিহত ৮০ জন, ১৪১টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭৩৬ জন ও নিহত ১৯ জন, ৫৫টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫০৩ জন ও নিহত ২ জন, ১৬টি বিএনপি-এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৩৪ জন, ২১টি আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫৭ জন ও নিহত একজন, ৮টি আওয়ামী লীগ-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১০ জন ও নিহত দুইজন, আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলে ১৩টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৫৩ জন ও নিহত সাতজন, এনসিপির অন্তর্কোন্দলে ১৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪৫ জন ইত্যাদি। নিহত ১২৯ জনের মধ্যে বিএনপির ৯১ জন, আওয়ামী লীগের ২৩ জন, জামায়াতের তিনজন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের একজন, ইউপিডিএফের ছয়জন এবং চরমপন্থী দলের একজন রয়েছেন। সহিংসতার ঘটনার ৭১৬টিই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল এবং বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের।
২৯৩টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৪২০ জন সাংবাদিক, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। হত্যা করা হয়েছে দুইজন সাংবাদিককে, আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ২৫৬ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৪৭ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৭৪ জন ও গ্রেফতার হয়েছেন ১৪ জন সাংবাদিক। এ ছাড়া ৩১টি মামলায় ১০৫ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
উদ্ধৃত সময়ে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৮০ জন আসামি মারা গিয়েছেন । এ ৮০ জনের মধ্যে ২৫ জন কয়েদি ও ৫৫ জন হাজতি। এটি উদ্বেগজনক যে, এ সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ২৪টি হামলার ঘটনায় ১৫ জন আহত, পাঁচটি মন্দির, ৩৭টি প্রতিমা ও ৩৮টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া জমি দখলের মতো চারটি ঘটনা ঘটেছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৬৯টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে ২৪ জন বাংলাদেশী নিহত, ৩৮ জন আহত ও ৬০ জন গ্রেফতার হয়েছেন। এ সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের জলসীমা থেকে ১৯টি ট্রলারসহ ১৬৩ জন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।
একই সময়ে কমপক্ষে ১৯০৯ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৭৮৯ জন, যাদের মধ্যে ৪৫৫ (৫৮%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১৭৪ (২২%) জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৬ জনকে ও আত্মহত্যা করেছেন ৯ জন নারী । ৪১০ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ২২৫ জন। কমপক্ষে ১৩০১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৬৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১০৩৮ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
এইচআরএসএস’র সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত এগারো মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংষর্ষে, হেফাজতে ও নির্যাতনে কমপক্ষে ৩১ জন নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ৮ জন সংঘর্ষে বা বন্দুকযুদ্ধের নামে, চারজন নির্যাতনে, ১২ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং সাতজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে ও অসুস্থ হয়ে গত এগারো মাসে আটজনের মৃত্যু হয়েছে।