আইইউটির ভিসি নিয়োগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিতর্কিত হস্তক্ষেপ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) পরিচালিত ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি)-তে ভিসি নিয়োগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও অশুভ হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান ভিসির পদত্যাগজনিত কারণে পদটি শূন্য হওয়ার পর নতুন ভিসি নিয়োগের লক্ষ্যে ওআইসি গত ১৩ মে ২০২৫ তারিখে আন্তর্জাতিকভাবে দরখাস্ত আহ্বান করে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিটি আইইউটির ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার করা হয়।

ওআইসির নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধা : প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ওআইসি প্রাপ্ত আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই শেষে অনলাইন সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তিনজন যোগ্য প্রার্থীর একটি প্যানেল চূড়ান্ত করে। এই তিন প্রার্থীর চূড়ান্ত সরাসরি সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য ৪ জানুয়ারি সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থিত ওআইসি সদর দফতরে দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়। এ লক্ষ্যে ওআইসি কর্তৃপক্ষ হোটেল বুকিং, টিকিটসহ সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এবং বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক ক্লিয়ারেন্সের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ জানায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রার্থীদের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত তিনজনের কাউকেই ক্লিয়ারেন্স না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এর ফলস্বরূপ, ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারিত সাক্ষাৎকার স্থগিত করতে বাধ্য হয় ওআইসি। পরবর্তী সময়ে ২০ জানুয়ারি ই-মেইলের মাধ্যমে প্রার্থীদের জানিয়ে দেয়া হয় যে, বাংলাদেশ সরকারের ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ায় তাদের আবেদন আর বিবেচনার সুযোগ নেই।

‘নিজস্ব প্রার্থী’ বসাতেই কি নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ?

এ দিকে একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র দাবি করছে, আইইউটির ভিসি পদে নিয়োগের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তির নিজস্ব একজন পছন্দের প্রার্থী রয়েছেন, যাকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে নিয়োগ দেয়ার উদ্দেশ্যেই ওআইসির চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যত থামিয়ে দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, পররাষ্ট্র উপদেষ্টার পছন্দের এই প্রার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং জাপান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বর্তমানে মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত এবং রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী পরিবারের সন্তান বলে পরিচিত।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে তিনি দেশে ফিরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়ার চেষ্টা করেন। তবে জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর তিনি পুনরায় মালয়েশিয়ায় চলে যান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- ওআইসি কর্তৃক প্রাথমিকভাবে বাছাইকৃত তিনজন প্রার্থীর তালিকায় তার নাম ছিল না।

যোগ্য প্রার্থীদের উপেক্ষার অভিযোগ : অন্য দিকে ওআইসি বাছাইকৃত তিনজন প্রার্থীই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে উত্তীর্ণ প্রকৌশলী। তারা সবাই বর্তমানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত।

তাদের মধ্যে দু’জন বুয়েটের অধ্যাপক- একজন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য এবং অন্যজন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য হিসেবে ডেপুটেশনে দায়িত্ব পালন করছেন। তৃতীয়জন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি।

অভিযোগ উঠেছে, এতসব যোগ্যতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওআইসি কর্তৃক বাছাইকৃত এই তিনজন প্রার্থীর ক্লিয়ারেন্স আটকে দিয়ে বিতর্কিত একজনকে ভিসি হিসেবে বসানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসনে প্রশ্ন : কূটনৈতিক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ওআইসি পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এ ধরনের হস্তক্ষেপ শুধু অনিয়মই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বায়ত্তশাসন ও বাংলাদেশের ভাবমর্যার জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। বিষয়টি দ্রুত স্বচ্ছ তদন্তের আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সাথে ওআইসির প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।