গাজায় নিহত বেড়ে ৭২,৫৯৯ : হামলা অব্যাহত

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৫৯৯ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। খবর আনাদোলু এজেন্সির। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এই সময়ের মধ্যে ৮২৩ জন নিহত এবং দুই হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখনো শত শত লাশ উদ্ধার করা হচ্ছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই সঙ্ঘাতে গাজার অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হাসপাতাল, সড়ক, বাসস্থানসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মানবিক সঙ্কট আরো গভীর হয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, অনেক এলাকা এখনো ধ্বংসস্তূপে ঢাকা পড়ে আছে, ফলে উদ্ধার কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পানি সঙ্কটকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরাইল

গাজা উপত্যকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কটকে কেন্দ্র করে মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা ‘ডক্টরস উইটআউট বর্ডারস’ অভিযোগ করেছে, ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে পানি সরবরাহ ব্যাহত করছে, যা এক ধরনের সমষ্টিগত শাস্তির রূপ নিয়েছে। খবর মিডলিস্ট মনিটরের।

সংস্থাটির সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামো ধ্বংস বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। লবণাক্ততা দূরীকরণ কেন্দ্র, পাইপলাইন ও নর্দমাব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, ফলে বিশুদ্ধ পানির প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক ফিলিস্তিনি নিহত বা আহত হয়েছেন। একই সাথে পানির অভাব, স্বাস্থ্যসেবা সঙ্কট ও ঘনবসতির কারণে বিভিন্ন প্রতিরোধযোগ্য রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, পানি ছাড়া জীবন অসম্ভব, এটি জেনেও অবকাঠামো ধ্বংস এবং সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে।

পশ্চিমতীরে নতুন বসতি নির্মাণের পরিকল্পনা

অধিকৃত পশ্চিমতীরের জেনিন অঞ্চলে ফিলিস্তিনি জমিতে ১২৬টি নতুন ঘর নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। ‘সানুর’ নামের যে অবৈধ বসতিটি প্রায় দুই দশক আগে খালি করা হয়েছিল, সেখানে আবার বসতি স্থাপনের এই সিদ্ধান্ত নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দ্রুতগতিতে এই পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ এই পদক্ষেপকে ‘শত্রুদের জন্য বার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্য দিকে বসতি স্থাপনকারীদের একজন নেতা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই এলাকাকে একটি শহরে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। কবর আনাদোলু এজেন্সির।

এ দিকে একটি মানবাধিকারধর্মী ইসরাইলি সংগঠন জানিয়েছে, ২০০৫ সালের প্রত্যাহার পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে উত্তর-পশ্চিমতীরে আবার বসতি স্থাপনের পথ তৈরি করা হয়েছে। সেই সময় ইসরাইল গাজা উপত্যকা ও পশ্চিমতীরের কিছু এলাকা থেকে একতরফাভাবে সরে গিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকারের আমলে পূর্ব জেরুসালেম ও পশ্চিমতীরে বসতি সম্প্রসারণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব এলাকা ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত হলেও সেখানে নতুন বসতি নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

গাজায় ধ্বংসস্তূপেই নতুন পথ তৈরির চেষ্টায় ফিলিস্তিনিরা

গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ দিনের ধ্বংসযজ্ঞের পর পুনর্গঠনের বড় পরিকল্পনা থমকে থাকায়, স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা এখন নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ ব্যবহার করে সড়ক মেরামতের কাজ শুরু করেছে। জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সহায়তায় পরিচালিত এই উদ্যোগে ভাঙা কংক্রিট ও লোহা চূর্ণ করে তা রাস্তা নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রয়টার্স জানায়, দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা হামলায় গাজার অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। আনুমানিক ছয় কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ জমে আছে, যা পানি সরবরাহ, হাসপাতালসহ জরুরি সেবার পথ বন্ধ করে দিয়েছে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম ফের চালু করাও কঠিন করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরানো ও পুনর্ব্যবহারের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সংগ্রহ করা ধ্বংসাবশেষ বাছাই ও চূর্ণ করে তা সড়ক সংস্কার, আশ্রয়কেন্দ্র এবং কমিউনিটি রান্নাঘর নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুস এলাকায় ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় ধুলায় আকাশ ঢেকে যাচ্ছে, আর শ্রমিকরা ঝুঁকি নিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কাজটি সহজ নয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ থাকার আশঙ্কা থাকায় প্রতিটি স্থান আগে পরীক্ষা করতে হচ্ছে, যা কাজের গতি ধীর করে দিচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সঙ্কটও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন শ্রমিক জানান, জীবিকার অন্য কোনো উপায় না থাকায় তিনি এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছেন। যুদ্ধ শেষ হলেও তাদের জন্য নতুন এক সংগ্রাম শুরু হয়েছে, তা হলো শহর পুনর্গঠন, অবকাঠামো ঠিক করা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াই। বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার ধ্বংসস্তূপ পুরোপুরি সরাতে প্রায় সাত বছর সময় লাগতে পারে। আর সম্পূর্ণ পুনর্গঠনে আগামী এক দশকে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। তবুও সীমিত সম্পদ নিয়েই ফিলিস্তিনিরা ধ্বংসস্তূপকে সম্পদে রূপান্তর করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।