দুই টাস্কফোর্সে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা
Printed Edition
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে দু’টি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। স্থলবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, অশুল্ক বাধা দূর করা, ব্যবসায়ী ভিসা সহজ করা, ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে এই উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তারা বলছেন, টাস্কফোর্স দু’টি শুধু আলোচনা ও প্রস্তাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে পারলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে নতুন গতি আসার পাশাপাশি বাংলাদেশও ভারতের বাজারে আরো বেশি পণ্য রফতানির সুযোগ পেতে পারে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন গতি দিতে দু’টি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব এসেছে। ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিআইআই) প্রস্তাবিত এই দুই টাস্কফোর্সের একটি অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) বাড়াতে কাজ করবে। অন্যটি সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, ব্যাটারি স্টোরেজ ও ডেটা সেন্টারের মতো উচ্চপ্রযুক্তির খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা খুঁজবে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, সম্প্রতি ঢাকায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুকতাদিরের সাথে সিআইআইয়ের প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এসব প্রস্তাব উঠে আসে। একই আলোচনায় ব্যবসায়ী ভিসা সহজ করা, স্থলবন্দরে পণ্য পরিবহন দ্রুত করা, অশুল্ক বাধা কমানো এবং বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ও গুরুত্ব পায়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে এই দুই টাস্কফোর্স কি শুধু ব্যবসায়িক সহযোগিতার নতুন প্ল্যাটফর্ম হবে, নাকি দীর্ঘদিনের একতরফা বাণিজ্য কাঠামো বদলে দুই দেশের জন্য তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ বাজার তৈরির পথও খুলবে।
বর্তমান বাণিজ্য পরিসংখ্যান বলছে, ভারসাম্যের জায়গাটি বাংলাদেশের জন্য এখনো বেশ দূরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিপরীতে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি ছিল প্রায় ১ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।
এ দিকে ভারতের সরকারি হিসাবেও একই ধরনের বড় ব্যবধান দেখা যায়। ভারতের লোকসভায় উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মোট পণ্য বাণিজ্য ছিল ১২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার; এর মধ্যে ভারত রফতানি করেছে ১১ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং বাংলাদেশ রফতানি করেছে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। দুই দেশের হিসাব পদ্ধতির পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট বাণিজ্য ভারসাম্য এখনো ভারতের পক্ষেই ব্যাপকভাবে ঝুঁকে আছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এর প্রশাসক ও প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: ফজলুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, এই বাস্তবতায় টাস্কফোর্সের অন্যতম বড় পরীক্ষা হবে বাংলাদেশী পণ্যের জন্য ভারতীয় বাজারে বাস্তব প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। শুল্ক সুবিধা থাকলেও বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা অশুল্ক বাধা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরীক্ষণ ও সনদায়ন, কাস্টমস প্রক্রিয়া, মানদণ্ড, লাইসেন্সিং, বন্দর-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ এবং উচ্চ লজিস্টিক ব্যয় বাংলাদেশী রফতানিকারকদের বাধার মুখে ফেলছে। ২০২৫ সালে ভারতের কিছু স্থলবন্দর দিয়ে তৈরী পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য ও আসবাবসহ কয়েক ধরনের বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশ সীমিত করার ঘটনাও বাজারে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের দিক থেকেও পাল্টা বাণিজ্য বাধার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ কয়েকটি স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এরপর ভারত বাংলাদেশী পণ্যের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করে এবং মে ও জুনে কয়েক ধরনের বাংলাদেশী পণ্যের স্থলপথে প্রবেশে আরো বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে।
এ দিকে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশে কাঁচামাল ও পণ্য আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে স্থলবন্দরগুলোর ধীরগতির কারণে ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে বেনাপোল স্থলবন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং আরো দ্রুত ও দক্ষ করা প্রয়োজন বলে তারা মত দিয়েছেন। তারা বলছেন, কখনো কখনো স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আনতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। এমন দীর্ঘ সময় আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেনাপোল-পেট্রাপোল করিডোরের গুরুত্বও এখানে কম নয়। ভারতের ল্যান্ড পোর্টস অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, পেট্রাপোল দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের স্থলভিত্তিক বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ পরিচালিত হয়। ভারতের হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যমানের হিসাবে ভারত-বাংলাদেশের স্থলপথের বাণিজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত এই সীমান্ত দিয়ে পরিচালিত হয়েছে। অর্থাৎ এই একটি করিডোরের দক্ষতা বাড়াতে পারলে দুই দেশের বাণিজ্য ব্যয় ও সময় কমানোর বড় সুযোগ রয়েছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ নয়া দিগন্তকে বলেন, এ দিকে শুধু বন্দর আধুনিক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কাস্টমসের ডিজিটালাইজেশন, যৌথ পরিদর্শন, ঝুঁকিভিত্তিক পণ্য যাচাই, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং দুই দেশের মধ্যে তথ্যবিনিময়ের ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। একই সাথে রেল ও নৌপথে পণ্য পরিবহন বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ দিকে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য রেলপথ, মহাসড়ক, বন্দর ও এলএনজি অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ভারতীয় বিনিয়োগ এসব খাতে বাংলাদেশের স্বার্থে হলে তা ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্য বাংলাদেশের অবস্থান শুধু ভারতীয় অর্থ আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বিনিয়োগের সাথে প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং রফতানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিট এফডিআই এসেছে ১০৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ১৩২ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে ভারতীয় নিট বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
এ দিকে সিআইআই-এর তথ্যে দেখা যায়, গত বছর ভারতে অবকাঠামো খাতে প্রায় ২৫ লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগ হয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। বাংলাদেশে অবকাঠামো টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশী-বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ দিকে ব্যবসায়ী ভিসাও দুই দেশের বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়ই উপেক্ষিত অবকাঠামো। নিয়মিত ব্যবসা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনে যাতায়াতকারী বাংলাদেশীদের কয়েক মাস পরপর নতুন ভিসার জন্য আবেদন করতে হয় এমন সমস্যার কথা বৈঠকে তুলে ধরেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি নিয়মিত ভ্রমণকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভিসা-ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। এর আগে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়ী ও চিকিৎসা ভিসা সহজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল।
সিআইআইয়ের প্রতিনিধিদলের সদস্য ও ইনফ্রাভিশন ফাউন্ডেশনের ম্যানেজিং ট্রাস্টি বিনায়ক চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ভারত ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে পিপিপি ও অবকাঠামো অর্থায়নে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। একই সাথে তিনি বাংলাদেশের সেতু, রেল, বিদ্যুৎ ও মেট্রোরেল প্রকল্পে অর্জিত অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সহযোগিতাটি একমুখী হওয়ার প্রয়োজন নেই; দুই দেশই পরস্পরের কাছ থেকে শেখার সুযোগ রাখে।
সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জিও বলেছেন, ভারতীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও নতুন শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী। তার মতে, ব্যবসায়ীদের হাতে থাকা সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে দুই দিকের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, রাজনৈতিক বিষয় থেকে যতটা সম্ভব বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আলাদা রেখে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশী রফতানিকারকদের জন্য ভারতের বাজারে অশুল্ক বাধা দূর করা না গেলে শুধু টাস্কফোর্স গঠন করে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, দুই টাস্কফোর্সের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে ঘোষণাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেয়া। একটি টাস্কফোর্স যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ, পিপিপি, বন্দর ও লজিস্টিকসের সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করে এবং অন্যটি উচ্চপ্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর ও নতুন শিল্পে যৌথ বিনিয়োগের পথ তৈরি করে, তাহলে সম্পর্কের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে। একই সাথে অশুল্ক বাধা, পণ্য পরীক্ষার পারস্পরিক স্বীকৃতি, কাস্টমস জটিলতা ও ভিসা সমস্যা সমাধান না হলে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুফল সীমিত থাকবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য সাফল্যের মাপকাঠি হবে শুধু ভারতীয় বিনিয়োগ কত বাড়ল বা দুই দেশের মোট বাণিজ্য কত হলো তা নয়; বরং বাংলাদেশ ভারতীয় বাজারে কত বেশি পণ্য রফতানি করতে পারল, বাণিজ্য ঘাটতি কতটা কমল, স্থানীয় শিল্প কতটা শক্তিশালী হলো এবং স্থলবন্দরে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কতটা কমল এসব সূচকেই টাস্কফোর্সের কার্যকারিতা মাপতে হবে। দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্য যদি বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধায় পরিণত করা যায়, তাহলে ‘দুই টাস্কফোর্স, এক বাজার’ কেবল একটি স্লোগান থাকবে না; এটি হতে পারে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন ভারসাম্যে নেয়ার একটি বাস্তব কাঠামো।