সাগরের বুকে এক নিস্বর্গ মাঝের চর
Printed Edition
রফিকুল হায়দার ফরহাদ, মাঝের চর, ভোলা থেকে ফিরে
‘ওই যে একটি চর দেখছেন। ওটা দেখতে বেশ সুন্দর।’ গত বছর পূর্ব ঢাল চর, ঢাল চর এবং তারুয়ার চর যাওয়ার সময় মাঝি আখতার এই বলে আমাকে প্রলুব্ধ করছিলেন। যাতে আমি সেখানে যাই। এতে তারও লাভ। আমাদের নিতে পারলে কিছু আয় হবে তার। নতুন চরে নেয়ার জন্য বাড়তি টাকা দিতে হবে। আবার আমারও নতুন একটি দ্বীপ/ চর দেখা হবে। তবে পূর্ব ঢাল চর থেকে ফিরতে দেরি হওয়া, সেই সাথে কুয়াশা এবং হঠাৎ মেঘনা নদীর মোহনার পানি উত্তাল হয়ে যাওয়ায় যাওয়ার সাহস হয়নি। দখিনা বাতাস শুরু হওয়ায় ঢেউগুলো বড় বড় হয়েই আমাদের ট্রলারে আঘাত করছিল। এবার আখতারের ভাই জাকির মাঝির কাছ থেকে তথ্য নিয়েছি এই চর সম্পর্কে। তাই চর পাতিলা থেকে বের হয়েই সোজা ট্রলার মাঝের চরের উদ্দেশে চালানোর নির্দেশ দিলাম মাঝি হোসেনকে।
খালি চোখে চর পাতিলা থেকে দেখা যাচ্ছিল না মাঝের চর। কুয়াশার সাথে দূরত্বও একটা কারণ। পূর্ব দিকে কিছু দূর এগোনোর পর ভেসে উঠলো মাঝের চর। হোসেন মাঝি যখন সাগরে অন্য জেলেদের জিজ্ঞেস করে মাঝের চরের অবস্থান সম্পর্কে জানছিলেন ততোক্ষনে আমরা দুপুরের খাবার পর্ব সম্পন্ন করছিলাম। কুকরি মুকরির ঘাট থেকে পাঁচটি ইলিশ মাছ কিনেছিলাম ৫০০ টাকা দিয়ে। মাঝি হোসেন, সহকারী মাঝি উঠতি ছেলে রাতুল, ট্রলারে সাগর পরিভ্রমণের জন্য গাইড হিসেবে নেয়া রাশেদ হাওলাদার এবং আমি। মাছ কাটার দায়িত্ব রাশেদের ছিল। ২০২২ সালেও সে ইলিশ ও কাঁকড়া কাটার কাজটি করেছিল। রাশেদ ও তার ভাই রাসেল মিলে কুকরি মুকরিতে পর্যটকদের জন্য তাঁবু ভাড়া দেয়। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করে। অন্যত্র ভ্রমণের জন্য ট্রলারের ব্যবস্থা করে। এবার রাশেদকে সহায়তা করে রাতুল। দুইজনেই বেশ ভালো রান্না করতে পারে। হোসেন মাঝি এবং আমি যখন চর পাতিলার লোকদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম তখন রান্নার কাজটি সম্পন্ন করে উঠতি বয়সের রাতুল ও রাশেদ। তাই চর পাতিলা থেকে ট্রলার ছেড়ে দেয়ার পর পরই দুপুরের খাবারের পর্ব শুরু। তবে চারজনের জন্য মাত্র দুটি প্লেট থাকায় আগে পরে খেলে হলো। আগে আমি ও হোসেন মাঝি খাবার খেলাম। এর পর রাশেদ ও রাহুল। হোসেন মাঝি যখন খাচ্ছিলেন তখন ট্রলারের বৈঠা ছিল রাতুলের নিয়ন্ত্রণে। রাহুল ১৪-১৫ বছরের হলেও গভীর সাগরে ট্রলার চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। তার বাড়ি পটুয়াখালীর চর মোন্তাজে। জীবিকার প্রয়োজনে চর কুকরি মুকরিতে হোসেন মাঝির ট্রলার চালায়।
আমরা অবশ্য সরাসরি হালকা উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে মাঝের চরে পৌঁছতে পারলাম না। সামনে পাতা ইলিশের জাল এবং ডুবো চর বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে আবার ঘুরে দক্ষিণ দিকে ট্রলার চালিয়ে এর পর উত্তর-পূর্ব দিকে গিয়ে পৌঁছলাম চরে। মাঝের চরের দক্ষিণ অংশ ভেঙে যাচ্ছে। অবশ্য এতে সুবিধাই হলো আমাদের। কারণ আমাদের ট্রলার সরাসরি পাড়ে গিয়ে ঠেকলো। ট্রলার থেকে লাফিয়ে চরে নামতে গিয়েই চোখে পড়লো সব নতুন লাগানো গাছ। নতুন মানে কয়েক বছর আগে লাগানো কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ নানান জাতের গাছ। বন বিভাগই নতুন চরে যেভাবে গাছ লাগায় মাঝের চরেও সেভাবেই বনায়ন হয়েছে।
উপকূলে অন্য চরের বনের মতোই এই মাঝের চরে বনায়ন। ঠিক মেঘনা নদীর মোহনায় এই চরকে দূর থেকে দেখতে দারুণ লাগছিল। চরে নামার পর আরো মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কারণ কোনো গাছেই বন্য প্রাণীর হামলা নেই। মানে মহিষ বা হরিণ গাছ খেয়ে ফেলেছে। কোনোটি হয়তো ঝড়ে ভেঙে গেছে। কোনোটি অন্য কোনো কারণে মারা গেছে এই যা। বিভিন্ন গাছে বেয়ে বেয়ে বড় হচ্ছে লতা জাতীয় গাছ। যেমন বানজুল লতা, লটকি কাঁটা এই জাতীয় গাছ। এই লতানো গাছগুলোর বয়সও কম। বনের মধ্যে যতটুকু হেঁটেছি কোনো প্রাণীর পায়ের ছাপই চোখে পড়লো না। তবে মানুষের হাঁটা পথ দেখেছি। কেওড়া ও গেওয়া গাছের শ^াসমূলগুলোর বয়সও কম। এর কারণ জানালেন হোসেন মাঝি। ‘মাত্র কয়েক বছর আগে চরের এই অংশে বনায়ন হয়েছে। এখন পর্যন্ত মহিষ বা হরিণ ছাড়া হয়নি এই চরে। তাই বনের গাছগুলো অক্ষত। তবে বনের ভেতরে বড় বড় গাছ আছে। এই গাছগুলো ১৫-২০ বছর আগে লাগানো হয়েছিল।’ রাশেদ জানাল, বন্য প্রাণী না ছাড়ার কারণ এখনো সেখানে জোয়ারের পানির উৎপাত, যা ওই প্রাণীগুলোর বেঁচে থাকার জন্য সহায়ক নয়। তাই কোনো হরিণ বা মহিষ নেই।’ শিয়ালও ছাড়া হয়নি এই চরে। হোসেন মাঝি জানান, আমরা ছোট বেলা থেকেই এই চরকে দেখে আসছি। এখানে আগে জংলা জাতীয় গাছ ছিল।
তবে বনে পাখি আছে। পাখি তো আর ছাড়া লাগে না। খাবার আর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পাখিরাই খুঁজে বের করে আস্তানা। আমরা চরে নামার আগেই একটি ছোট মাছরাঙ্গা ও একটি সাদা বক ও বড় মাছরাঙ্গাকে উড়ে যেতে দেখলাম। জাতীয় পাখি দোয়েল সব উপকূলীয় বনের পরিচিত পাখি। মাঝের চরেও তাই। সাথে উপকূলীয় পাখিও দেখলাম। বক তো এই সব বনের নিত্যসঙ্গী। সাথে পানকৌড়িও।
মাঝের চরের দুই পাশ দিয়ে নদী। তাই এখানে প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। জেলেরাও এই মাছ ধরার জন্য এই চরে আসে। সন্ধ্যার আগেই চর কালকিনি বা চর নিজামে পৌঁছতে হবে, তাই আমরা আর বেশিক্ষণ দেরি করিনি মাঝের চরে। এ চর থেকে বেরিয়ে চর কালকিনি বা চর নিজামের দিকে যাওয়ার সময় মাঝের চরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি চোখে পড়লো। সেখানে পড়ন্ত বিকেলে বকের ঝাঁক বসেছিল মাছ শিকারের জন্য।