পাহাড় ধসে হিমালয়ের নদীতে নেমে এসেছে কাদা ও পাথরের স্রোত। এতে নেপাল ও চীনের তিব্বতে অন্তত ৮০০ জন বিদেশীসহ দেড়হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত ১৬০ জনেরও বেশি লোকের মৃত্যুর খবর এসেছে। নেপাল ও তিব্বতে চলছে উদ্ধার ও ত্রাণতৎপরতা।
এই ধস একদিনে হয়নি। পাহাড় থেকে বিশাল বরফ ও পাথরের ধস প্রথমে লাহেন্দে নদীর ওপর আটকে যায়। এতে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়। এই বাঁধটি ভেঙে জমে থাকা পানি প্রবল বেগে নেমে আসে ভোতে কোশি নদীতে। সেখান থেকে ভয়াবহ হড়পা বানের তৈরি হয়। এই বান গিয়ে মেশে ত্রিশূলী নদীতে। তারপর নেমে আসে দুর্যোগ। নেপালের রাসুয়া ও চিতওয়ান থেকে শুরু করে তিব্বতের গিয়িরং কাউন্টি পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা প্লাবিত হয়। হড়পা বানে তাসের ঘরের মতো ভেসে যায় জনপদ, হাইড্রো-পাওয়ার প্ল্যান্ট, পুলিশ পোস্ট ও সেতু। বছরের এই সময়টিতে ভারতীয় পর্যটকেরা সনাতন ও বৌদ্ধ ধর্মের তীর্থস্থান মানস সরোবর এবং গোসাইকুণ্ডে যান। এ কারণে ওইসব এলাকায় ছিল হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি। এ কারণে বিপর্যয়ের মাত্রা আরো বেড়ে যায়।
কেন এই বিপর্যয় হয়েছে? এর কারণ খুঁজতে গিয়ে প্রথমদিকে দায়ী করা হয় ভূমিকম্পকে। পরে স্যাটেলাইট ও ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটি মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘটা প্রলয়ঙ্করী হিমবাহ-ধসের কারণে ঘটেছে।
বাস্তবতা হলো, পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলেই- সেটা নেপালের পাহাড়ি গিরিখাত হোক কিংবা বাংলাদেশের নদী অববাহিকা- আমরা এমন এক জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির ভরসায় ভৌত অবকাঠামো গড়ে তুলছি, বাস্তবে যার অস্তিত্ব নেই। প্রকল্প বা বাজেটের নকশা তৈরি হয় কেবল ৩০ বা ৫০ বছরের গড় বৃষ্টিপাত কিংবা বর্ষার গড় পানি প্রবাহর ওপর ভিত্তি করে। এই গড় হিসাব কাগজে-কলমে স্বস্তি দেয়। বাজেটের জন্যও সুবিধাজনক। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এসে সেসব ‘গড় পরিস্থিতি’ খাটে না।
জলবায়ুর বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাবে চরম দুর্যোগের মাত্রা এখন বহুগুণ বেড়েছে। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বা নদীপথের সেতুগুলো বছরের শান্ত সময় অর্থাৎ ৯০ শতাংশ দিনের জন্য উপযুক্ত, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু বাকি ১০ শতাংশ সময় যখন প্রকৃতি অশান্ত থাকে, সেই সময়ের ধাক্কা সামলাতে ব্যর্থ হয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে সব। প্রতি শরতে বা বর্ষায় একই স্থানে গড় নকশায় বারবার অবকাঠামো তৈরি করা স্রেফ সরকারি অর্থের অপচয়। সেইসাথে মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলার শামিল।
নেপালের এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের নীতি-কাঠামোয় পরিবর্তন আনা জরুরি। স্পর্শকাতর পাহাড়ি ও নদীকেন্দ্রিক অঞ্চলে গড় আবহাওয়ার ওপর ভিত্তি করে অবকাঠামোর নকশা করা বন্ধ করতে হবে। সেইসাথে চরম ধাক্কা সামলানোর পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে পূর্বাভাসভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সক্রিয় করা জরুরি। এতে সঙ্কেত পাওয়ামাত্রই মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য সচেষ্ট হওয়া যাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোকে নজিরবিহীন বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। প্রকৃতির বৈরিতা সামলানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। এজন্য সক্ষমতা অর্জনে পরিকল্পনা গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন করা এখন সময়ের দাবি।