গত দুই বছর ধরে দেশের শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানায় তালা ঝুলছে। দেয়ালে ‘স্থায়ীভাবে বন্ধ’ কিংবা ‘অনির্দিষ্টকালের ছুটি’র নোটিশ লাগানো আছে। কর্মহীন শ্রমিকের হতাশার দৃশ্য চার দিকে। অর্থনীতির এই চিত্র অনাকাক্সিক্ষত।
গত দুই বছরে দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া গভীর উদ্বেগের। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বন্ধ হওয়া ৪৫৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তৈরী পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর ১০৮টি, নিটওয়্যার খাত- বিকেএমইএর ৩৫টি, টেক্সটাইল খাত- বিটিএমইএর আটটি এবং রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা সংলগ্ন বেপজাসংশ্লিষ্ট ১৯টি কারখানা আছে। শুধু তাই নয়, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও তীব্র গ্যাস সঙ্কটে অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
কারখানাগুলো বন্ধে পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ না থাকা যেমন বড় কারণ, তেমনি মালিকদের আর্থিক সঙ্কটও পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। সাথে যুক্ত হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ ও উচ্চমূল্য। উৎপাদন সক্ষমতা ৩০-৪০ শতাংশ কমলেও শ্রমিকের মজুরি, কারখানা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও ব্যাংক ঋণের সুদের মতো স্থায়ী ব্যয় অপরিবর্তিত থাকছে। তাই উৎপাদন কমার সাথে সাথে ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। অন্য দিকে শিল্প কারখানার বিপুল অংশের খেলাপি ঋণের সাথে ব্যাংক খাতের দুর্বলতার সম্পর্ক উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় যদিও সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া বিশেষ তহবিল, প্রণোদনা এবং ‘প্রস্থান’ সুবিধা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু ঋণ দিয়ে এই সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় । যে কারখানা গ্যাসের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারে না, সেটিকে নতুন ঋণ দিলে এর উৎপাদনশীলতা ফিরবে না। বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত না করে ঋণের বোঝা বাড়ানোও সমাধান নয়।
শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রকৃত সঙ্কটে থাকা কিন্তু সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সহজ শর্তে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও প্রকৃত ব্যবসায়িক সঙ্কটে পড়া উদ্যোক্তাদের শনাক্তের পর তাদের বিষয়ে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি নিতে হবে। উৎপাদন ব্যয় কমানোর বিষয়েও ভাবতে হবে। শ্রমিকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের উদ্যোগও জরুরি। পাশাপাশি নতুন রফতানি বাজার সৃষ্টির উদ্যোগও নিতে হবে।
শিল্পনীতি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত। কারখানার গেটে তালা পড়ার পর ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে সঙ্কটের পূর্বাভাস পেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া শ্রেয়। একটি কারখানা বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি ব্যবসার সমাপ্তি নয়, এর সাথে যুক্ত শ্রমিকের জীবন, স্থানীয় অর্থনীতি, ব্যাংকব্যবস্থা এবং জাতীয় উৎপাদন।
শিল্পের চাকা সচল রাখা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা নয়। এটি জাতীয় অর্থনীতির অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন। তাই এখনি কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হলে শিল্পাঞ্চলের গেটে ঝুলতে থাকা তালা একসময় দেশের পুরো অর্থনীতির ওপর অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া ফেলবে। এমন অবস্থা আমাদের কারো জন্য কাম্য নয়।