অতিরিক্ত মূল্য ও চুক্তির কঠোরতা কিভাবে বাস্তবে রূপ নিয়েছে
বিদুু্যুৎ খাতের পোস্টমর্টেম
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত মূল্য ও রাজস্ব চাপ কেবল নীতিগত ব্যর্থতার ফল নয়। এটি নির্দিষ্ট কিছু প্রকল্প ও চুক্তির ভেতর দিয়ে বাস্তবে কিভাবে তৈরি ও পুনরুৎপাদিত হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে জাতীয় সংস্কার কমিশনের (এনআরসি) বিশ্লেষিত একাধিক ‘কেস ক্লাস্টার’-এ। এই পর্বে আলাদা কোনো কোম্পানি বা প্রকল্পকে অভিযুক্ত করার বদলে দেখানো হয়েছে, কিভাবে একই ধরনের চুক্তি কাঠামো ও দরকষাকষিভিত্তিক সিদ্ধান্ত বিভিন্ন সময় ও প্রযুক্তিতে একই রকম ফল তৈরি করেছে।
কমিশনের বাছাই করা কেসগুলো তিনটি মানদণ্ডে নির্ধারিত- রাজস্ব প্রভাবের গুরুত্ব, চুক্তি ও ক্রয় কাঠামোর প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র এবং যাচাইযোগ্য তথ্যের প্রাপ্যতা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজর দেয়া হয়েছে ট্যারিফ কাঠামো, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, প্রকৃত উৎপাদন এবং বার্ষিক আর্থিক প্রভাবের দিকে।
এইচএফওভিত্তিক রেন্টাল ও আইপিপি : জরুরি যুক্তি, স্থায়ী বোঝা : কিউইইইএস আইনের শুরুর দিকে ভারী জ্বালানি তেল (এইচএফও) ভিত্তিক রেন্টাল ও আইপিপি প্ল্যান্টগুলোকে দ্রুত বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবিলার সমাধান হিসেবে আনা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দরপত্র ছাড়াই সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি হয়।
এনআরসির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব প্ল্যান্টের ট্যারিফ যুক্তিসংগত বেঞ্চমার্কের তুলনায় গড়ে ৪০-৫০ শতাংশ বেশি ছিল। সময়ের সাথে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল হলেও এবং সিস্টেমে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় ব্যবহার কমে গেলেও এই প্রিমিয়াম কমেনি। কম উৎপাদন সত্ত্বেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও স্থায়ী চার্জ চলতে থাকায় ইউনিটপ্রতি প্রকৃত খরচ দাঁড়িয়েছে অত্যন্ত বেশি। জরুরি যুক্তি অনেক আগেই শেষ হলেও এর আর্থিক দায় থেকে গেছে।
আনসোলিসিটেড কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস প্রকল্প : একাধিক কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস প্রকল্প প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বদলে ‘আনসোলিসিটেড বা অনাহূত প্রস্তাব’-এর মাধ্যমে অনুমোদিত হয়। এগুলোকে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও ট্যারিফ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এগুলো প্রায় একই উচ্চ দামের একটি ব্যান্ডে আটকে আছে- যা প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের চেয়ে দরকষাকষিভিত্তিক মানদণ্ডের ইঙ্গিত দেয়।
গ্যাস সঙ্কটের কারণে এসব প্ল্যান্ট পুরো সক্ষমতায় চালানো যায়নি। তবু ‘টেক-অর-পে’ ধারা অনুযায়ী ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হয়েছে। ফলে উৎপাদন কম, কিন্তু স্থায়ী অর্থপ্রদান বেশি- অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় নিশ্চিত।
সৌর বিদ্যুতের সস্তা প্রযুক্তি, ব্যয়বহুল চুক্তি : সৌর বিদ্যুৎ খাতে বৈশ্বিকভাবে প্রযুক্তির দাম দ্রুত কমছিল। কিন্তু কিউইইইএস আমলে অনুমোদিত একাধিক সৌর প্রকল্পের ট্যারিফ সেই বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতে পারেনি। এনআরসির হিসাবে, আন্তর্জাতিক নিলাম ও দেশীয় সরকারি প্রকল্পের তুলনায় এসব সৌর ট্যারিফ গড়ে ৭০-৮০ শতাংশ বেশি।
এক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রমী স্থানগত বা প্রযুক্তিগত কারণ পাওয়া যায়নি, যা এই অতিরিক্ত মূল্যকে যৌক্তিক করে। কম ভেরিয়েবল খরচ সত্ত্বেও স্থায়ী ট্যারিফ কাঠামো অতিরিক্ত মূল্যকে সরাসরি বার্ষিক আর্থিক বোঝায় রূপ দিয়েছে।
গ্যাস ও এলএনজি-নির্ভর তাপবিদ্যুৎ : ঝুঁকি পুরোপুরি সরকারের ঘাড়ে : গ্যাস ও এলএনজি নির্ভর প্রকল্পগুলোকে জ্বালানি বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে আনা হলেও বাস্তবে এলএনজি অবকাঠামোর দেরি, আন্তর্জাতিক দামের অস্থিরতা ও টাকার অবমূল্যায়ন বড় সমস্যা তৈরি করেছে। চুক্তিতে জ্বালানি খরচের পূর্ণ পাস-থ্রু ও বৈদেশিক মুদ্রা সূচক সংযুক্ত থাকায় সব ঝুঁকি গিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবির) ওপর।
পেমেন্ট ও উৎপাদনের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এপিএসসিএল ও সিডিসির মতো কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন অংশ বেশি হলেও অর্থপ্রাপ্তি তুলনামূলক কম, যা কম দামের দেশীয় গ্যাস ব্যবহারের প্রতিফলন। বিপরীতে কিছু বেসরকারি গ্রুপ, বিশেষ করে সামিট ও ওরিয়নের ক্ষেত্রে উৎপাদনের তুলনায় অর্থপ্রাপ্তি অনেক বেশি। এটি চুক্তির ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও উচ্চ ট্যারিফ কাঠামোর ফল।
সামিটের মেঘনাঘাট-২ প্রকল্পের উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস না থাকলে এই দ্বৈত জ্বালানি (গ্যাস/এইচএসডি) প্ল্যান্ট চালাতে গেলে ইউনিট খরচ ৪ গুণেরও বেশি বেড়ে যায়। চালালেও বিপুল ক্ষতি, না চালালেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট- দুটোই বিপিডিবির জন্য ‘ফিসকাল বোমা’।
আদানি চুক্তি : সবচেয়ে স্পষ্ট ব্যতিক্রম : ভারতের ঝাড়খণ্ডে স্থাপিত আদানি গড্ডা বিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি সবচেয়ে আলোচিত কেস। কেন বাংলাদেশে নয়, কেন ভারতে প্ল্যান্ট- এ নিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়নি। অথচ দুই ক্ষেত্রেই আমদানিকৃত কয়লা ব্যবহার করতে হতো, উপরন্তু ভারতে হলে দীর্ঘ দূরত্বে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়। চুক্তির অনুমোদিত ট্যারিফ ছিল সমসাময়িক সব বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তির মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থবছর ’২৪ সালে এই চুক্তিতে ইউনিটপ্রতি প্রায় ৪-৫ মার্কিন সেন্ট অতিরিক্ত মূল্য কাঠামোগতভাবে যুক্ত ছিল। এটি জ্বালানি দামের ওঠানামা নয়, বরং ক্যাপাসিটি চার্জ, বৈদেশিক মুদ্রা সূচক, কর ‘গ্রস-আপ’ এবং ঝুঁকি একতরফা সরকারের ঘাড়ে চাপানোর ফল।
এনআরসি বলছে, দরপত্র ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের ন্যূনতম প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা, গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি নথিভুক্ত না করা এবং জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা- এসবই প্রাথমিকভাবে দুর্নীতি ও যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়।
পুনরাবৃত্ত ধারা, একক ফল : সব কেস মিলিয়ে কয়েকটি অভিন্ন ধারা স্পষ্ট- প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বদলে দরকষাকষিভিত্তিক ট্যারিফ, ক্যাপাসিটি পেমেন্টে ব্যবহার ঝুঁকি থেকে বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা, জ্বালানি ও মুদ্রা ঝুঁকি পুরোপুরি রাষ্ট্রের ওপর আর সক্ষমতা বাড়ার সাথে ব্যবহার কমে গিয়ে ইউনিট খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি আইপিপিগুলোর ক্ষেত্রে কমিশন ‘ইয়ার ১৩ কারেকশন’-এর কথা বলছে- যখন ঋণ পরিশোধ শেষ, তখন ক্যাপাসিটি চার্জ নাটকীয়ভাবে কমানো না হলে প্রকল্পগুলো ভাড়াভিত্তিক রেন্ট-সিকিংয়ে পরিণত হয়।
এই কেস ক্লাস্টারগুলো দেখায়, বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত মূল্য কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়- এটি কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত। চুক্তির নকশা, ক্রয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ঠিক না করলে আইন বদলালেও ফল বদলাবে না।
সরকারের হাতে এখনো লিভারেজ আছে- বকেয়া পরিশোধকে চুক্তি সংস্কারের সাথে যুক্ত করা। তা না হলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ কমবে না, বরং ভবিষ্যতেও একই গল্প ঘুরে ফিরে আসবে।