তালপাতার পাখার গ্রাম দামপাড়া

Printed Edition

আল আমিন কিশোরগঞ্জ

চৈত্রের খরতাপে যখন গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা, তখন স্বস্তির প্রতীক হয়ে ওঠে তালপাতার হাতপাখা। আর এই পাখাকেই ঘিরে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার দামপাড়া গ্রামে গড়ে উঠেছে এক অনন্য অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের জীবিকা নির্ভর করছে এই ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ওপর।

চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ এই তিন মাসে তালপাখার চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ফলে গ্রামের নোয়ারহাটি, টেকপাড়া ও বর্মনপাড়ায় ঘরে ঘরে শুরু হয় উৎপাদনের ব্যস্ততা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নারী-পুরুষ, এমনকি শিশু-কিশোররাও যুক্ত হয় এই কাজে। উঠানজুড়ে বসে তালপাতা কাটা, বুনন, ছাঁচ তৈরি, বাঁশের হাতল লাগানো থেকে শুরু করে রঙের কাজ, সবকিছুই হয় সমন্বিত শ্রমে।

এই শিল্পের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর পারিবারিক ও প্রজন্মান্তরের ধারাবাহিকতা। আশুলতা রায় (৮০) বা ভানুমতি সূত্রধরের মতো প্রবীণরা জানান, অন্তত ছয়-সাত দশক ধরে এ গ্রামে তালপাখা তৈরি হচ্ছে। শাশুড়ির হাত ধরে শেখা এই কারিগরি দক্ষতা আজ নাতি-নাতনীদের হাতেও পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ, এটি শুধু পেশা নয়, এক ধরনের উত্তরাধিকার।

তবে এই ঐতিহ্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতার কঠিন হিসাব। এক সময় স্বল্প খরচে তৈরি হওয়া একটি পাখা এখন গড়ে ৬০ টাকার মতো ব্যয়ে তৈরি হলেও বিক্রি হয় মাত্র ৮০ থেকে ৮৫ টাকায়। কাঁচামালের দাম, বিশেষ করে তালপাতা, বাঁশ, বেত, সুতা ও প্লাস্টিক, গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে লাভের পরিমাণ কমে গিয়ে কারিগরদের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করেছে।

দামপাড়ার এই শিল্পের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো নারীকেন্দ্রিক শ্রমবিন্যাস। মূলত নারীরাই পাখা তৈরির কাজ করেন, আর পুরুষেরা কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা করেন। এতে গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ যেমন বাড়ছে, তেমনি পারিবারিক আয়ের একটি নির্ভরযোগ্য উৎসও তৈরি হচ্ছে। তবে শিশুরা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজে যুক্ত হওয়ায় শিক্ষা ও শ্রমের ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

বাজার ব্যবস্থায়ও এসেছে পরিবর্তন। আগে কারিগরদের বাজার বা মেলায় গিয়ে পণ্য বিক্রি করতে হতো। এখন পাইকাররা সরাসরি গ্রামে এসে পাখা কিনে নিয়ে যান। এতে বিপণন সহজ হলেও দাম নির্ধারণে কারিগররা অনেক সময় বঞ্চিত হন।

যান্ত্রিক যুগে বৈদ্যুতিক পাখা, জেনারেটর ও আইপিএসের প্রসার সত্ত্বেও হাতপাখার চাহিদা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং লোডশেডিং ও তীব্র গরমের সময়ে এটি আবারো প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। বাজার ধরে রাখতে কারিগররা পাখায় রঙিন নকশা ও জরি সংযোজন করছেন, যা পণ্যে নতুনত্ব এনেছে।

তবুও টিকে থাকার লড়াই সহজ নয়। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, সীমিত লাভ এবং বিকল্প পেশার অভাব, সব মিলিয়ে কারিগরদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। অনেকেই সুদমুক্ত ঋণ ও সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

দামপাড়ার তালপাখা শুধু একটি পণ্য নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, নারীর অংশগ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্প টিকে থাকতে পারে আরো দীর্ঘ দিন, নইলে হারিয়ে যেতে পারে এক সময়ের সহজ অথচ অপরিহার্য এই জীবনযাপনের অংশ।