অবসর ও কল্যাণ ভাতা নিয়ে সরকারের উদ্যোগ
শিক্ষকদের আশা জাগলেও সহসাই সঙ্কট কাটছে না
Printed Edition
শাহেদ মতিউর রহমান
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ ভাতা নিয়ে সরকারের নতুন উদ্যোগেও সমস্যা কাটছে না। বিশেষ করে তহবিল সঙ্কটের কারণে শিক্ষকরা তাদের সমুদয় প্রাপ্য অর্থ এখনি পাচ্ছেন না। যদিও গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানে নতুন করে তহবিলে দেড় হাজার কোটির বেশি অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন; কিন্তু শিক্ষকদের অনেকেই বুঝতে পারছেন না তারা এই অর্থ কবে পাবেন। গত রোববার এবং গতকাল সোমবার অনেকেই অবসর ও কল্যাণ বোর্ডে এসে ভিড় করছেন তাদের কল্যাণ এবং অবসর ভাতার অর্থের জন্য। অথচ এই অর্থ পেতে তাদের বছরের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে। শুধু ঘোষণা শুনেই শিক্ষকরা এখন ঢাকা এসে দৌড়ঝাঁপ করছেন তাদের প্রাপ্য টাকার জন্য।
ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অনেকেই জানান তাদেরকে বছরের পর বছর শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শেষে অবসরে যাওয়া পর জীবনের শেষ সময়ে স্বস্তি দেয়ার কথা অবসর ভাতা ও কল্যাণ ভাতার মাধ্যমে। কিন্তু বাস্তবে এই পাওনা পেতে তাদের অনেককেই বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড সূত্র জানায়, সারা দেশে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। তাদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধা পরিচালিত হয় দু’টি পৃথক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কল্যাণ সুবিধা দেয় শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট এবং অবসর সুবিধা দেয় শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড। শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করা চাঁদা, ব্যাংকে জমা থাকা অর্থের সুদ এবং সরকারের বিভিন্ন সময়ে দেয়া থোক বরাদ্দ ও বন্ডের মুনাফার ওপর নির্ভর করেই মূলত এই সুবিধার অর্থ পরিশোধ করা হয়। অবসর সুবিধার জন্য চাকরিকালে শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ সুবিধার জন্য ৪ শতাংশ চাঁদা কেটে রাখা হয়। ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই হারে চাঁদা নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসর সুবিধা এবং ৩০ টাকা কল্যাণ সুবিধা তহবিলে জমা হয়। বাকি অর্থ সরকার এবং তহবিলে জমা থাকা অর্থের সুদ থেকে সমন্বয় করা হয়।
সূত্র মতে, এখন পর্যন্ত আবেদন করা ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর সুবিধার পুরো অর্থ পরিশোধ করতে প্রয়োজন প্রায় ৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। অবসর সুবিধা বোর্ডে বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এবার দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, সর্বোচ্চ গ্রেডের শিক্ষক অবসর সুবিধা হিসেবে মোট প্রায় ৩৮ লাখ টাকা এবং কল্যাণ সুবিধা হিসেবে প্রায় ১৫ লাখ টাকা পেতে পারেন। গ্রেড ও চাকরিকালের ওপর ভিত্তি করে এই অর্থ কমবেশি হয়। দু’টি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করা চাঁদা মিলিয়ে অবসর সুবিধার জন্য বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা জমা হয়। অথচ অবসর নেয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য পুরো অর্থ পরিশোধ করতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২১০ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ প্রতি মাসেই বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যায়।
সূত্র জানায়, এর আগে গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে প্রায় ৬৭ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন ছিল। এসব আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রয়োজন প্রায় আট হাজার ৭১০ কোটি টাকা, অথচ অবসর তহবিলে জমা ছিল প্রায় এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় সাত হাজার ৪১০ কোটি টাকা। একই সময়ে কল্যাণ ট্রাস্টে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২১ জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন ছিল; এগুলো নিষ্পত্তিতে প্রয়োজন প্রায় তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
সূত্র আরো জানায়, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত আবেদনকারীদের মধ্যে ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর সুবিধার একাংশের অর্থ ছাড় করা হয়েছে। এতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। একইভাবে ৫৩ হাজার ৪৭৭টি কল্যাণ সুবিধার আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৬৪৭ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। তবে সেটিও অনেকের সম্পূর্ণ পাওনা নয়। ফলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর টাকা পাওয়া শুরু হলেও শিক্ষকদের অসন্তোষ পুরোপুরি দূর হয়নি। তাদের প্রশ্ন চাকরিজীবনে নিয়মিত বেতন থেকে চাঁদা কেটে নেয়া হলে অবসরের পর সেই টাকা পেতে এত দীর্ঘ অপেক্ষা কেন?
এদিকে ২০১৭ সালে অবসর ও কল্যাণ খাতে চাঁদার হার বাড়ানো হলেও এর বিপরীতে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা না দেয়ার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ রয়েছে। এ নিয়ে আইনি লড়াইও হয়েছে। অবশ্য মূল বেতনের ১০ শতাংশ কেটে নেয়ার বিপরীতে বাড়তি আর্থিক সুবিধা এবং নির্দিষ্ট সময়ে অবসর সুবিধা দেয়ার বিষয়টি আদালতে ওঠে। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট অবসরের ছয় মাসের মধ্যে সুবিধা দেয়ার নির্দেশও দেন।
একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জানান, অবসরের পর পাওয়া অর্থ দিয়ে সংসার চালানোর পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘ অপেক্ষায় তাকে চিকিৎসার খরচ মেটাতে ধারদেনা করতে হয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সঙ্কট নয়; অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মানসিক চাপও বাড়িয়ে দিচ্ছে। চাকরিজীবনের শেষ পর্যায়ে এসে নিজের জমা করা অর্থের জন্য অফিসে ঘোরাকে তারা মর্যাদাহানিকর বলেও মনে করছেন।
সরকার নতুন উদ্যোগর আওতায় এখন অনলাইন আবেদন, সফটওয়্যার, জনবল বৃদ্ধি এবং আইবাসের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীও সংসদে এর আগে এসব পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন।
শুধু এককালীন বরাদ্দ দিয়ে পুরনো আবেদন মেটানো সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে একই সমস্যা যাতে আবার না হয়, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি তহবিল ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। শিক্ষক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের দাবি সরকারকে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে, তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অবসর গ্রহণের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা দেয়ার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। এ ছাড়াও বিশেষ বা এককালীন বড় বরাদ্দ দিয়ে শিক্ষকদের পাওনা পরিশোধের ওপর গুরুত্ব দেয়া দরকার।