সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক

খেলাপি ঋণ উদ্ধারে কঠোরতা অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর উদ্যোগ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বর্তমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনাকে সামনে রেখে দেশের আর্থিক খাতে একাধিক নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু ব্যাংকিং সেবার পরিধি বাড়ানো নয়; বরং খেলাপি ঋণের চাপ কমানো, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, রফতানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে আরো স্থিতিশীল করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এসব উদ্যোগ আর্থিক ব্যবস্থাকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ ও টেকসই করার ভিত্তি তৈরি করছে। তবে এসব পরিকল্পনার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, ব্যাংকগুলোর জবাবদিহি এবং নীতির ধারাবাহিকতার ওপর।

ডিজিটাল লেনদেনে বড় পরিবর্তন

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে সারা দেশে আন্তঃপরিচালনযোগ্য ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অভিন্ন কিউআর-কোডভিত্তিক লেনদেন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে একজন গ্রাহক যেকোনো ব্যাংক, এমএফএস বা পিএসপি প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট মার্চেন্টের বাংলা কিউআর স্ক্যান করে লেনদেন করতে পারবেন। ইতোমধ্যে প্রায় ২৪ লাখ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তার কাছে বাংলা কিউআর সরবরাহের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ভাতা, কৃষি ভর্তুকি ও অন্যান্য আর্থিক সহায়তা দ্রুত ও নিরাপদে পৌঁছে দিতে জাতীয় কার্ড স্কিম ‘টাকা-পে’ ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফ্রিল্যান্সার ও সেবা রফতানিকারকদের বৈদেশিক আয় দেশে আনার পথ সহজ করতে ব্যাংক-মধ্যস্থতাকারী কাঠামো এবং আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। এতে ডিজিটাল সেবা রফতানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার সুযোগ বাড়বে।

কৃষিতে ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়াতে ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। তিন বছর মেয়াদি এই তহবিল থেকে কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ সুদ বা মুনাফায় ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গাচাষি ও নারী কৃষকদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা শুধু ফসল দায়বদ্ধতার বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ নিতে পারবেন। একই সাথে কৃষকদের পুরনো দায় পরিশোধের উদ্যোগ নেয়ায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তাদের পুনরায় ফিরিয়ে আনা এবং নতুন ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রফতানি পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তুলতে আরো তিন হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। এতে কৃষিভিত্তিক সিএমএসএমই এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ অর্থায়ন

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে সিএমএসএমই খাতের চলতি মূলধন ও বিনিয়োগের চাহিদা মেটাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ বা মুনাফায় অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আকার তিন হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় তিন হাজার ৫০২ জন গ্রাহককে ৯১০ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার তথ্যও রয়েছে। বেকার তরুণ-তরুণীদের আত্মকর্মসংস্থানে এক হাজার কোটি টাকার প্রাক-অর্থায়ন তহবিল এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে আরো এক হাজার কোটি টাকার স্কিম নেয়া হয়েছে।

রফতানি বহুমুখীকরণে নজর

দীর্ঘদিন ধরে তৈরী পোশাকনির্ভর বাংলাদেশের রফতানি কাঠামোতে বৈচিত্র্য আনতে পাট, চামড়া, কৃষিপণ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি, জুতা ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতকে সামনে আনা হয়েছে। রফতানি বহুমুখীকরণে তিন হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করে গ্রাহক পর্যায়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ ও আংশিকভাবে সচল শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু এবং রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানের কার্যকর মূলধনের সঙ্কট কাটাতে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রাক-অর্থায়ন স্কিম নেয়া হয়েছে। এ তহবিল থেকে কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ উৎপাদন ব্যয় এবং রফতানি আদেশ বাস্তবায়নে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।

খেলাপি ঋণ উদ্ধারে কঠোর অবস্থান

ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ। এ সমস্যা মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক চার দফা পরিকল্পনা নিয়েছে। যেসব ব্যাংকে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের সাথে ত্রৈমাসিক বৈঠক, শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণের আদায় অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং উচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকের জন্য এনপিএল সমাধান কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি ব্যবস্থা জোরদার, এক্সিট পলিসির আওতায় ঋণ সমন্বয় এবং অনাদায়ী ঋণ অবলোপনের বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন এবং ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়নের কাজ চলছে।

আমানতকারীর আস্থা পুনর্গঠন

অসুস্থ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামো নেয়া হয়েছে। ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করে সুরক্ষিত আমানতের সীমা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে ইতোমধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। একই সাথে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসানের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের সুরক্ষার কাঠামোও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাব কমানো ও অর্থপাচার রোধ

ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত করতে ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১ সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিচালকের যোগ্যতা, মেয়াদসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তনের লক্ষ্যে ‘ব্যাংক-কোম্পানি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। বিদেশে পাচার করা অর্থ শনাক্ত ও দেশে ফিরিয়ে আনতেও কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। অর্থপাচারকারী শনাক্তকরণ এবং পাচার করা অর্থ ফেরত আনার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ২৮টি পারস্পকারিক আইনগত সহায়তার আবেদন পাঠানো হয়েছে।

রিজার্ভে ইতিবাচক ধারা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা ১৭ ফেব্রুয়ারি ছিল ৩৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের চাপ থাকা সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার পরিধি ডিজিটাল অর্থনীতি থেকে কৃষি, সিএসএমইএ, রফতানি, ব্যাংকিং সংস্কার, আমানত সুরক্ষা, খেলাপি ঋণ আদায়, অর্থপাচার প্রতিরোধ ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে কাগজে-কলমে পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়নই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায়, ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পাচার করা অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করতে পারলে ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠনের পথ আরও শক্তিশালী হবে। অন্যদিকে কৃষি, সিএসএমইএ ও রফতানিমুখী শিল্পে স্বল্পসুদের অর্থায়ন কার্যকরভাবে পৌঁছানো গেলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, উৎপাদনশীল খাতে অর্থপ্রবাহ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার সাফল্যের মূল মাপকাঠি হয়ে উঠবে।