ঢাকা-আশুলিয়া উড়ালসড়ক

চীন ভারত ও থাইল্যান্ডের চেয়ে বাংলাদেশে ব্যয় তিনগুণ বেশি

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

বাংলাদেশে শ্রমের মূল্য কম অথচ বিভিন্ন দেশের তুলনায় অবকাঠামো উন্নয়ন খরচ অনেক বেশি। এমনকি আশপাশের দেশগুলোর তুলনায়ও সড়ক অবকাঠামো খাতে এই ব্যয় তিন থেকে চার গুণেরও বেশি। সমীক্ষা সঠিক না হওয়া, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা ও ব্যয় বৃদ্ধি, পরামর্শক খাতে ব্যয়, প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ হতে বিলম্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে জড়িয়ে থাকে দুর্নীতির ফাঁদ। এই ফাঁদেই অবকাঠামো থেকে শুরু করে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে যায়। ২৪ কিলোমিটারের ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো সড়ক নির্মাণ খরচ ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে তিনগুণ বেশি। এসব দেশে ২১৭ কোটি থেকে ৬৩০ কোটি টাকা প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ খরচ পড়লেও বাংলাদেশে এই প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে এক হাজার ১২৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। চার বছর ১০ মাসে যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা, সেটি এখন এক যুগ পেরিয়ে যাচ্ছে। খরচ বেড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি বা ১০ হাজার ১৪৪ কোটি ৩৫ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। প্রকল্প দলিলের সর্বশেষ তথ্যে মিলছে এর সত্যতা।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, মেগা প্রকল্পের নামে মহাদুর্নীতি ও লুটপাটে কামেয়ি গোষ্ঠীরা লাভবান হয়। প্রকল্প পরিচালক মো: শফিকুল ইসলাম অবশ্য বলেন, অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করলে হবে না। আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়; যা ভারতসহ অন্যান্য দেশের আমদানি করতে হয় না। সেতু বিভাগের প্রকল্প সংশোধিত দলিলের তথ্য বলছে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে সাভার ইপিজেড থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সিগন্যাল ফ্রি ৪৪ কিলোমিটার নতুন এলিভেটেড রাস্তা তৈরি হবে। উত্তরাঞ্চল থেকে যানবাহনগুলো সরাসরি ঢাকা অতিক্রম করে দক্ষিণাঞ্চলে যাবে। এতে ঢাকার যানজট অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এ ছাড়া সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর এর রফতানিমুখী শিল্পাঞ্চল থেকে দ্রুত পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে। একই সাথে এটি নির্মিত হলে এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ক এবং প্রায় সব জাতীয় মহাসড়কের সাথে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ঢাকার সাথে বিভিন্ন জেলার সংযোগ স্থাপনকারী আবদুল্লাহপুর-আশুলিয়া-বাইপাইল-চন্দ্রা করিডোরে যানজট অনেকাংশে হ্রাস পাবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বলছে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ০.২১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশুলিয়া হয়ে ইপিজেড পর্যন্ত ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দৈর্ঘ্য ২৪ কিলোমিটার। ২০১৭ সালে এটি ১৬ হাজার ৯০১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে চার বছর ১০ মাসে বাস্তবায়নের জন্য একনেক অনুমোদন দেয়। ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হবার কথা ছিল। এরপর ১ম সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি চার লাখ টাকা। প্রকল্পের অর্থায়নের বিষয়ে গত ২৬ অক্টোবর ২০২১ তারিখ চায়না এক্সিম ব্যাংক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা পরবর্তীতে ১০ মে ২০২২ সালে হতে কার্যকর হয়েছে। গত ১২ নভেম্বর ২০২২ সাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা ও গাজীপুর জেলার মোট ১১১.৬৬২৩ একর ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন এবং দুই হাজার ৪৭ জনকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় ভৌত নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭২ শতাংশ এবং নির্মাণকাজের ভৌত অগ্রগতি ৬৬ শতাংশ। প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় হলো ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। যার মধ্যে সরকারের ১৩ হাজার ৮০৩ কোটি ১৫ লাখ ৮৩ হাজার টাকা এবং চীনের ঋণ ১৩ হাজার ২৪২ কোটি ৫২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। প্রকল্প এখন ২০৩০ সালের জুনে শেষ করতে হবে। প্রথমে এটি ২০২২ সালের জুনে শেষ করার কথা ছিল।

প্রায় ৯ বছরে অগ্রগতি : ২০১৭ সালে অনুমোদন পেলেও এই মেগা প্রকল্পের জুলাই ২০২৬ সাল পর্যন্ত আট বছর ১১ মাসে অগ্রগতি মাত্র ৭২ শতাংশ এবং নির্মাণকাজের ভৌত অগ্রগতি ৬৬ শতাংশ। যেখানে ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পটি সমাপ্ত হয়ে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কথা ছিল। এখন এটির কাজ শেষ হতে ১২ বছর ১০ মাস সময় ধরা হয়েছে।

বিভিন্ন দেশের সাথে খরচের তুলনা : চীনের পাহাড়ি এলাকায় খরচও বাংলাদেশের চেয়ে কম

চীনে ইবিন-পাঞ্জিহুয়া এক্সপ্রেসওয়ে ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই এক্সপ্রেসওয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই এলিভেটেড অংশ হিসেবে নির্মিত। পাহাড়ি ভূখণ্ড, অসংখ্য সেতু ও টানেলের মতো জটিল প্রকৌশল কাজ থাকা সত্ত্বেও প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ২০ কোটি ইউয়ান বা বাংলাদেশী টাকায় আনুমানিক ৩৬৬ কোটি টাকা। ২০২৬ সালে প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হয়েছে। তবে চীনের প্রকল্পটির বিপুল দৈর্ঘ্যরে কারণে ৪২৭ কিলোমিটারের প্রকল্পের ইউনিটপ্রতি ব্যয় ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে করিডোরের সাথে সরাসরি তুলনা করা যায় না।

মালয়েশিয়ার ডাস : বেশি ব্যয়, কিন্তু সুবিধাও বেশি

মালয়েশিয়ার দামনসারা-শাহ আলম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (ডাস) বাংলাদেশের জন্য আরো উপযোগী তুলনা হতে পারে। ২০.১ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকল্পটির ব্যয় ৪.১৮ বিলিয়ন রিংগিত; অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২০.৮ কোটি রিংগিত। যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা। তবে ডাসের ব্যয়ের বিনিময়ে শুধু উড়ালসড়ক নয়, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, একাধিক ইন্টারচেঞ্জ, শব্দ-প্রতিরোধক বেড়া, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎসংক্রান্ত সুবিধাদি এবং অবিরাম টোল আদায় ব্যবস্থার মতো বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। এর পরও তাদের কিলোমিটারে ব্যয় ৬৩০ কোটি টাকা।

ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা : ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা-সিকাম্পেক ও এলিভেটেড টোল রোড প্রকল্পও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। ৩৬.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এলিভেটেড টোল রোডের নির্মাণ ব্যয় প্রায় ১১.৬৬ ট্রিলিয়ন রুপিয়া; অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৪২৭ বিলিয়ন রুপিয়া। ২০২৬ সালের কাছাকাছি বিনিময় হার ধরে এটি প্রায় ৩২৪ কোটি বাংলাদেশী টাকা প্রতি কিলোমিটার।

ভারতের প্রকল্পে ব্যয়ের চিত্র : ভারতের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েব তথ্য মতে, চেন্নাই বন্দর-মাদুরভয়াল উড়ালপথ ২০.৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল-টিয়ার এলিভেটেড করিডোরটির ব্যয় তিন হাজার ৫০০ কোটি রুপির বেশি। আগামী বছর কাজ শেষ হওয়ার কথা। হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ১৬৭ কোটি রুপি বা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ২১৭ কোটি বাংলাদেশী টাকা।

মুম্বাইয়ের ইস্টার্ন ফ্রিওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ১৩.৯ কিলোমিটার। মহারাষ্ট্রের মুম্বাই মেট্রোপলিটন রিজিয়ন ডেভেলপমেন্ট অথরিটির তথ্যানুযায়ী প্রকল্পটির অনুমোদিত পরিমাণ তিন হাজার ৩১৪ কোটি রুপি। নির্মাণ চুক্তির মূল্য দুই হাজার ৬৮২ কোটি রুপি। চুক্তি ব্যয় ধরে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১৯৩ কোটি রুপি বা প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম খরচ।

প্রকল্পের খাতভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনা

বর্তমান সরকারের আমলেই এটি ৬০ শতাংশের বেশি খরচ বৃদ্ধি পায়। মেয়াদও বাড়ে আট বছর। ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা প্রকল্প খরচের মধ্যে ৫৫৯ কোটি টাকা যাবে পরামর্শক খরচ। যেটা প্রথমে ৩০৫ কোটি টাকা ছিল। এখন তিন হাজার ৮১২ জন মাস পরামর্শক ব্যয় হবে ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে প্রতি মাসে প্রতি জনে খরচ ১৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। পারিতোষিক সম্মানী যাবে ২১ কোটি টাকা। ইউটিলিটি স্থানান্তরে যাবে ৫১৫ কোটি টাকা। ৫৫.৩৯ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে খরচ ধরা হয়েছে তিন হাজার ৪৯৫ কোটি ৮৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ফলে প্রতি হেক্টরের দাম ৬৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। র‌্যাম্প, লেন, টোল প্লাজাসহ অন্যান্য খাত বাদে শুধু ২৪ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়েতে যাবে ১৪ হাজার ৯৭ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ লাখ টাকা। এখানে প্রতি কিলোমিটারে খরচ ৫৮৭ কোটি ৩৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা।