ইরানে মার্কিন হামলা স্থগিত ঘোষণা
নেপথ্যে অস্ত্র মজুদে টানের খবর
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা ছাড়াই আরেকটি রাত পার করেছে ইরান। প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের মধ্যে সাময়িকভাবে সামরিক অভিযান স্থগিত রেখেছে ওয়াশিংটন। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুদ কমে যাওয়ার আশঙ্কা নতুন করে বড় ধরনের হামলা স্থগিতের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে। খবর এএফপির।
টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতে চলা মার্কিন বোমা হামলার পর এই বিরতি আবারো আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের আশা তৈরি করেছে। তবে মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা অস্ত্রের মজুদ নিয়ে উদ্বেগের কারণেও এই বিরতি হতে পারে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ঘিরে সংঘর্ষের কারণে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যাহত হয়। পরে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ে এই জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের বাইরে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, আঞ্চলিক নৌ চলাচল এবং উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোও হামলার শিকার হয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান বর্তমানে ‘স্থগিত রয়েছে’ বলে জানিয়েছে সিএনএন। পেন্টাগনের এক অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে তারা এ তথ্য জানায়। যদিও শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরো ‘অনেক বড় মাত্রার’ হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, অভিযানের মাত্রা বাড়ানোর পরিকল্পনা আংশিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ কমে আসছে। সংবাদমাধ্যমটি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
খবরে বলা হয়, ট্রাম্পকে একই সাথে কয়েকটি ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা করতে হচ্ছে- এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের অবনতি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কার সম্ভাবনা। সিএনএন জানিয়েছে, শুক্রবার হোয়াইট হাউজের এক বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন সঙ্ঘাত আরো বাড়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কেইন ট্রাম্পকে জানান, সামরিক বাহিনী তার অনুমোদিত যেকোনো অভিযানের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম। তবে এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কেও তিনি সতর্ক করেন।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে আবার পূর্ণমাত্রার অভিযান শুরু করবেন কি না, সে বিষয়ে তিনি এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা এখন তাদের সাথে কথা বলছি। আমার মনে হচ্ছে তারা আরো বেশি গুরুত্বের সাথে বিষয়টি বিবেচনা করছে।’
ট্রাম্প আরো বলেন, ইরানের সামনে দু’টি পথ রয়েছে- একটি হলো চুক্তিতে পৌঁছানো, অন্যটি হলো ‘আরও অনেক বড় মাত্রার’ হামলার মুখোমুখি হওয়া। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ট্রাম্প ধারণা করেছিলেন এটি চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হবে না। কিন্তু এখন সঙ্ঘাত প্রায় পাঁচ মাসে গড়িয়েছে। আসন্ন নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ রিপাবলিকান দলের নেতা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওপরও প্রভাব ফেলছে। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, পেন্টাগন ট্রাম্পের কাছে ১৪তম রাতের হামলার একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল। তবে তিনি সেটির অনুমোদন না দিয়ে আলোচনার পথকে অগ্রাধিকার দেন।
এ দিকে সঙ্ঘাত নতুন একটি ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, শনিবার তারা সৌদি আরবের জিজান ও ইয়ানবু এলাকায় সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর একদিন আগে রিয়াদ হাউছি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। গ্রিক বিমানবাহিনীর গণমাধ্যম কার্যালয় জানিয়েছে, সৌদি আরবে মোতায়েন গ্রিক সেনাদের পরিচালিত একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইয়ানবুর আকাশে দু’টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও একটি ড্রোন ধ্বংস করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা চারটি জাহাজ থামিয়েছে। তেহরানের কার্যকর অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালী এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সঙ্ঘাতের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, সঙ্ঘাত আরো ছড়িয়ে পড়ার জন্য ইরানকে দায়ী করা যাবে না। তিনি হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে আলোচনা আয়োজনের জন্য মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যার কোনো সমাধান সম্ভব নয়।’
ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি কুয়েত
তা ছাড়া মেহর নিউজ ও টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক অভিযানে অংশ নেয়ার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে কুয়েত। দেশটির আকাশপথ বা ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানে কোনো আক্রমণ চালানো হয়নি বলে সাফ জানিয়েছে কুয়েত সরকার। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক খবর প্রকাশের পরেই এই স্পষ্ট অবস্থান জানাল কুয়েত। গত শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে কুয়েত এবং বাহরাইন গোপন বিমান হামলা চালিয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরানের ভেতরে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা এবং ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রের গুদামে ওই হামলা চালানো হয় বলে দাবি করা হয়। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাত ওই মিশনে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বলেও দাবি করেছিল সংবাদমাধ্যমটি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত কুয়েতের রাষ্ট্রদূত শেখা আল-জেইন আল-সাবাহ ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ডে একটি চিঠি পাঠান। ওই প্রতিবেদনে করা সব দাবিকে তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে অভিহিত করেন। কুনা সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রদূত তার চিঠিতে পরিষ্কার করে বলেন, কুয়েত ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেয়নি। আক্রমণাত্মক কোনো অভিযান চালানোর জন্য নিজেদের ভূখণ্ড, আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহারের অনুমতিও তারা কাউকেই দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলা চালালে যুদ্ধের পরিধি বাড়বে : ইরানের সেনাবাহিনী
যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর আবারো হামলা শুরু করে, তবে এবার যুদ্ধের পরিধি আরো বিস্তৃত হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানি সেনাবাহিনী। দেশটির সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো নতুন আগ্রাসনের চূড়ান্ত জবাব দিতে তারা প্রস্তুত রয়েছে।
রোববার (২৬ জুলাই) রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আর্কেমিনিয়া বলেন, মার্কিনিরা যদি আবারো ইহুদিবাদীদের ফাঁদে পা দেন কিংবা তাদের নির্দেশ অনুসারে চলে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। বিশেষ করে বিমান হামলার মাধ্যমে, তাহলে ভৌগোলিকভাবে এই যুদ্ধের পরিসর বাড়বে। এই মন্তব্য এমন সময়ে এলো যখন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আগামীকাল মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করবেন। একই সাথে তিনি ইসরাইলপন্থী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়ও যোগ দেবেন। অন্য দিকে সেনাবাহিনীর আরেক মুখপাত্র জেনারেল আব্দুল ফজল শেখারচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে এবং ইরানকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, মার্কিনিদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি একেবারে বিশৃঙ্খল ও অনাকাক্সিক্ষত। জেনারেল শেখারচি আরো জানান, যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধে নতুন কৌশল খুঁজছে। তার কথায়, মার্কিনিরা যদি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তাহলে নিজেদের ইচ্ছায় পারবে না। এর জন্য তাদের ইহুদিবাদীদের অনুমতি লাগবে।
মার্কিন ৮ ঘাঁটিতে হামলা, ২০০ জনের বেশি মার্কিন সেনা নিহত
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে ‘অপারেশন নাসর-২’ নামে ১৫ দিনব্যাপী পাল্টা অভিযান পরিচালনা করেছে তারা। শনিবার (২৫ জুলাই) তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে ব্যবহৃত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকেই এই অভিযানের মূল লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে অন্তত ৮টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়, যার মধ্যে একটি ঘাঁটির ২০টি হ্যাঙ্গার সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের প্রকৃত চিত্র ধামাচাপা না দিয়ে তা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্ত করতে মার্কিন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মোহেবি। পাশাপাশি, নিরপেক্ষভাবে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া মার্কিন ঘাঁটিগুলো পরিদর্শনের সুযোগ দেয়ার দাবি জানিয়েছে তেহরান। তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইআরজিসির এই দাবিগুলো বা হতাহতের কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।