৩ ঘণ্টার বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা
Printed Edition
চট্টগ্রাম ব্যুরো
মাত্র তিন ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই কোথাও বুক সমান, কোথাও কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করেছে নগরীর পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। এর মধ্যে দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ৫১ মিলিমিটার। বৈশাখী ঝড়ের প্রভাবে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নগরবাসীকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এ ছাড়া আগামী ৪৮ ঘণ্টা বজ্রসহ ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে এক দফা বজ্রসহ সামান্য বৃষ্টিপাত হয়। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিক থেকে শুরু হয় বজ্রসহ টানা ভারী বর্ষণ, চলে বেলা ৩টা পর্যন্ত। এরপর আস্তে আস্তে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে নেমে আসে। ভারী বৃষ্টিতে নগরীর প্রবর্তক মোড়, চকবাজার, কাপাসগোলা, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, হালিশহর, নিউমার্কেট, তিন পুলের মাথা, কাতালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কে পানি জমে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দেখা গেছে প্রবর্তক মোড় ও কাতালগঞ্জ এলাকায়। এই দুই এলাকার সড়কে কোথাও কোথাও কোমর থেকে বুকসমান পানি জমে। মূলত কয়েকটি খালের রিটেইনিং ওয়ালের কাজ চলমান থাকায় খালের মাঝে বাঁধ দেয়া হয়। পানি চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয় মোটা পাইপের সাহায্যে। তা ছাড়া খাল-নালা ভরাট, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং ময়লা-আবর্জনায় ড্রেন আটকে থাকায় জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দুপুরের দিকে ভারী বৃষ্টিপাত চলাকালেই প্রবর্তক মোড়ের বড় অংশ ডুবে যায় কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে। বদনা শাহ মাজার গেট থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত পুরো সড়ক মুহূর্তেই ডুবে যায় পানিতে। একপর্যায়ে পানির স্রোতে সেখানে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সরেজমিন নগরীর কাতালগঞ্জ এবং প্রবর্তক মোড়ে গিয়ে দেখা যায় বুকসমান পানি। অনেকেই রিকশায় সিটের ওপরে কাঠের মধ্যে বসে সড়ক পাড়ি দিচ্ছেন। আবার সেখানে কোনো কোনো গাড়ি দ্রুত চালিয়ে নেয়ায় মানুষের গায়ে ঢেউ আছড়ে পড়তেও দেখা গেছে। পথচারী বিশেষ করে বহু শিক্ষার্থীকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগকে সঙ্গী করে পানি মাড়িয়েই হেঁটে পথ পাড়ি দিতে দেখা গেছে। এ সময় কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, আমাদের নেতারা যে পানি উপহার দিয়েছে, তা চট্টগ্রামবাসী মনে রাখবে। পাহাড়কাটা বন্ধ না করতে পারলে খাল খনন করে কোনো লাভ হবে না বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেন।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো: নুরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ৯৬ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টিপাতের শঙ্কা রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে আজ বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আকাশ আংশিক মেঘলা থেকে অস্থায়ীভাবে মেঘাচ্ছন্ন থাকবে। অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
এ দিকে সিটি মেয়র ডা: শাহাদাত হোসেন পানিতে নিমজ্জিত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, আগ্রাবাদ, প্রবর্তক, বাকলিয়া এক্সেস রোড, দক্ষিণ বাকলিয়া, রাহাত্তারপুল, পশ্চিম বাকলিয়া সব মিলিয়ে আমি পুরোটা এলাকা ঘুরেছি, প্রচুর পানি। বৃষ্টিটা যেহেতু একনাগাড়ে হয়েছে আমাদের ড্রেনেজ সিস্টেম যেখানে আছে সেখানে মোটামুটিভাবে জলাবদ্ধতা হয়নি। আমি যেটা দেখতে পাচ্ছি যেসব এলাকায় আর্মিরা কাজ করছে বিশেষ করে হিজরা খাল, জামালখান খাল, মুরাদপুর বক্স কালভার্টসংলগ্ন খালটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। রিটেইনিং ওয়াল দিতে বাঁধ দিতে হয়েছে। প্রবর্তক, পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ- এই তিনটি এলাকার বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দেয়ায় পানি যাওয়ার পথ সরু হয়েছে। ফলে পানি যেতে প্রচুর সময় লাগছে এবং এতে কোমর সমান পানি হয়ে গেছে। প্রত্যেক সেবা প্রদানকারী সংস্থার সাথে আমরা গত দুই মাস ধরে দফায় দফায় আলোচনা করছি। ১৫ মে’র মধ্যে এসব খালের কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আশা করি মে’র শেষের দিকে বর্ষা শুরু হলে এভাবে জলাবদ্ধতা থাকবে না।
শ্রীমঙ্গলে ২৪ ঘণ্টায় ১৫৮ মিমি বৃষ্টির রেকর্ড
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, দেশের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সাথে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৮ দশমিক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে শ্রীমঙ্গলস্থ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: আনিসুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘২৭ এপ্রিল সকাল ৬টা থেকে ২৮ এপ্রিল দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩০ ঘণ্টায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড করা হয় ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত।
আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, এর আগের ২৪ ঘণ্টায় (২৬ এপ্রিল সকাল ৬টা থেকে ২৭ এপ্রিল সকাল ৬টা পর্যন্ত) ৫০ মিলিমিটার এবং তার আগের দিন ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। ফলে গত চার দিনে মোট বৃষ্টিপাত দাঁড়িয়েছে ২৬৯ মিলিমিটার। এ ছাড়া ২৭ এপ্রিল রাত সোয়া ৯টার দিকে ঝড়ো হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৫৬ কিলোমিটার (৩০ নটিক্যাল মাইল) রেকর্ড করা হয়।
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের কিছু স্থানে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে সিলেট বিভাগসহ বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে।