বাংলাবর্ষে শোভাযাত্রার নতুন নাম ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’
Printed Edition
সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক
‘আনন্দ শোভাযাত্রা’, বা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নয়, এবার থেকে বাংলাবর্ষের শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানিয়েছেন পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের হওয়া শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে এখন থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করা হয়েছে। গতকাল রোববার সচিবালয়ে সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইউনেসকো স্বীকৃত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ করে। গত ৩১ মার্চ সংস্কৃতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, শোভাযাত্রাটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে চলে আসছিল। আমাদের কোনো অ্যালার্জি নেই যে ‘মঙ্গল’ দিলে আমাদের ক্ষতি হবে বা ‘আনন্দ’ দিলে আমাদের লাভ হবে। আমরা আনন্দ ও মঙ্গলের এই বিতর্ককে অনর্থক মনে করি।
তিনি আরো বলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিবর্তে আনন্দ শোভাযাত্রা নাম দেয়ায় আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু এটি দেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। পরে ২ এপ্রিল কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ বলেছে, ‘শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দেশব্যাপী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আচরিত ধর্মীয় ঐতিহ্য ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে পয়লা বৈশাখের মতো জাতীয় উৎসবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করা হলে ওলামায়ে কেরাম চুপ করে বসে থাকবেন না।
সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘নাম (শোভাযাত্রা) নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আমরা এই বিতর্কের অবসান করতে চাই। আজকের বৈঠকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা এটিকে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ও বলব না, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ও বলবো না। শোভাযাত্রা হবে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে, যেখানে সব সংস্কৃতির প্রদর্শন থাকবে। যার যার মতো ঢোল-বাদ্য, পোশাক-আশাক নিয়ে একটি আনন্দঘন শোভাযাত্রা হবে। এই শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। বৈশাখীমেলা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, বৈশাখী আনন্দ সবকিছুতেই আমরা বৈশাখকে হাইলাইট করতে চাই। এটি আমাদের সিদ্ধান্ত।’
নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘পয়লা বৈশাখ নিয়ে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হাজার বছরের পুরনো পয়লা বৈশাখ ১৯৮৯ সালে এরশাদের আমলে এই শোভাযাত্রা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে চালু হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা ‘আনন্দ’ বাদ দিয়ে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ করে। অন্তর্বর্তী সরকার এসে আবার এর নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ করে।’ ‘এখন কেউ বলছে, শোভাযাত্রার নাম ‘আনন্দ’ই থাকতে হবে, আবার কেউ বলছে ‘মঙ্গল’ হতে হবে।’
সংস্কৃতি মন্ত্রী বলেন, ‘এ সরকারের দায়বদ্ধতা জনগণ, জাতি ও দেশের কাছে। আমরা চাই, অতীতের যা কিছু গ্লানি তা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কিন্তু আমরা সমাজে বিভাজন চাই না। মানুষের মধ্যে অনৈক্য ও সঙ্ঘাত আমরা চাই না। আমরা বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য চাই। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বিভিন্ন মত, আদর্শ ও ভাবনার মানুষ থাকবে এটিই গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য।’
নাম ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করায় ইউনেসকোর স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কি ইউনেসকো দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র? যখন নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ ছিল, তখনো ইউনেসকো ছিল; যখন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল, তখনও ইউনেসকো ছিল। আমরা তাদের জানিয়ে দেবো আমাদের দেশে এখন থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হবে- এটাই আমাদের ঐতিহ্য।’
তিনি বলেন, ‘শোভাযাত্রার নামে ইউনেসকো কোনো স্বীকৃতি দেয়নি। তারা স্বীকৃতি দিয়েছে বৈশাখের উৎসবকে। এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে। আমাদের সংস্কৃতি কি শুধু শোভাযাত্রা? আরো অনেক কিছু রয়েছে।’
এ দিকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঈমান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় পয়লা বৈশাখে অনুষ্ঠিত মঙ্গল শোভাযাত্রা স্থায়ীভাবে বন্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। গতকাল জনস্বার্থে এই রিট পিটিশন দায়ের করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো: মাহমুদুল হাসান (মামুন)। ওই রিটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকা জেলা প্রশাসক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং চারুকলা অনুষদের ডিনকে বিবাদি করা হয়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকার জনরোষের ভয়ে মাঝে মধ্যে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে। পরবর্তীতে আবার কিছুদিন পরেই আবার ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামেই ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তাই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সমাধানের জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে।
রিট পিটিশনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মঙ্গল শোভাযাত্রা কোনো প্রাচীন বাঙালি ঐতিহ্য নয়; বরং এটি ১৯৮৯ সালে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে শুরু হওয়া একটি নবসৃষ্ট ও কৃত্রিম কার্যক্রম, যা পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে পয়লা বৈশাখের মূল সংস্কৃতির সাথে কৌশলে যুক্ত করা হয়েছে।
রিটে বলা হয়, পাখি, মাছ ও পশুর বিশালাকৃতির প্রতিকৃতি বহন করে ‘মঙ্গল’ বা ‘কল্যাণ’ প্রার্থনা করা ইসলামী আকিদা ও ইমানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী, কারণ মুসলমান কেবলমাত্র আল্লাহর কাছেই মঙ্গল বা কল্যাণ প্রার্থনা করতে পারে।
রিট পিটিশনে আরো বলা হয় যে, মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত বহু প্রতিকৃতি হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন প্রতীকের সাথে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত, যা মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র ধর্মীয় ক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে দেশে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের বাস্তব, আসন্ন এবং অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রিটে উল্লেখ করা হয়, এই পরিস্থিতি সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের ‘আইনের সুরক্ষা’ ও ‘জীবনের অধিকার’-এর সরাসরি লঙ্ঘন। আইনজীবী মো: মাহমুদুল হাসান (মামুন) রিটে উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই নবসৃষ্ট ও কৃত্রিম কার্যক্রম চাপিয়ে দেয়া সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত, যা সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী। তিনি বলেন, ‘মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ইমান আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, জননিরাপত্তা এবং জাতীয় স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।’
রিটে পয়লা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন, প্রচার, অনুমোদন বা যেকোনোভাবে পরিচালনা থেকে বিবাদিদের বিরত রাখার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। রিটে আরো বলা হয়, এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে তা দেশের সামগ্রিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। জানা গেছে, রিট পিটিশনটি শিগগিরই হাইকোর্টের ২০ নম্বর কোর্টে শুনানি হবে।