ম্যাকাই টেস্ট জমিয়ে রাখলেন শরিফুল

Printed Edition
khela
চোট থেকে ফিরেই ধসিয়ে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইন। উইকেট নেয়ার পর এভাবেই উল্লাসে মাতেন শরিফুল : ক্রিকইনফো

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ইনজুরিতে পড়ে প্রথম টেস্টের দলে না থাকায় সতীর্থদের সাথে অস্ট্রেলিয়ার বিমানে চড়া হয়নি শরিফুল ইসলামের। ফিটনেস টেস্টে পাস করার পর একাই পাড়ি দেন ক্যাঙ্গারুদের দেশে। দ্বিতীয় টেস্টের একাদশে সুযোগ পাওয়া নিয়েও ছিলেন দোলাচলে। আগের দিনও তার দলে থাকার নিশ্চয়তা দেননি প্রধান কোচ ফিল সিমন্স। গতকাল দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনে দলে সুযোগ পেয়েই করলেন টেস্ট ক্যারিয়ারে নিজের সেরা বোলিং। প্রথম দিন শেষে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ১৬৫ রানে ৮ উইকেট হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। মাত্র ৩৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে স্বাগতিকদের চাপে রেখেছেন শরিফুল। টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথম ১৩ টেস্টের ২৩ ইনিংসে তার শিকার ছিল ২৭ উইকেট। ১৪তম ম্যাচে এসে নিজের প্রথম ফাইফারের দেখা পেলেন শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে। জানালেন, প্রতিপক্ষের বোলারদের দেখেই এমন বোলিং করেছেন তিনি।

বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশার নয়। ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পরও অস্ট্রেলিয়াকে আটকে রাখার সুযোগ তৈরি করেছে বোলাররা। প্রথম ইনিংসে ১০১ রানের লিড নিয়েও তাই প্যাট কামিন্সের দলের নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই। দিনের গল্পটা দুই পেসারের। শুরুতে স্টার্কের আগুনে বাংলাদেশের ব্যাটিং পুড়েছে, পরে সেই আগুনই শরিফুল ফিরিয়ে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে।

ব্যাট হাতে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১৪ রান করার পর বল হাতে যেন অন্য এক শরিফুলকে দেখা গেল। ইনজুরি কাটিয়ে একাদশে ফেরা বাঁ হাতি এই পেসারের তোপে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপও বারবার কেঁপে উঠেছিল। প্রথম দিন শেষে ৮ উইকেটে ১৬৫ রান নিয়ে মাঠ ছেড়েছে স্বাগতিকরা। বাংলাদেশের বিপক্ষে তাদের লিড ১০১ রান হলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া।

মিচেল স্টার্ক যখন বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে ছিন্নভিন্ন করছিলেন, তখন হয়তো অস্ট্রেলিয়া ভেবেছিল ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনটা তাদের জন্য একতরফা আনন্দেরই হবে। ২২ বলের মধ্যে পাঁচ উইকেট, শেষ পর্যন্ত ছয় শিকার-স্টার্কের আগুনে বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় মাত্র ৬৪ রানে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেননি শরিফুল ইসলাম।

জবাবে প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই স্বস্তিতে ছিল না অস্ট্রেলিয়া। তাসকিন আহমেদের বলে ম্যাট রেনশ ৮ রানে ফিরলে ২২ রানে প্রথম উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। এরপর বল হাতে নিজের প্রথম স্পেলেই ম্যাচের রঙ বদলে দেন শরিফুল। অষ্টম ওভারে এসে প্রথমে ট্রাভিস হেডকে ২২ রানে বোল্ড করেন তিনি। চার বল পর মার্নাস লাবুশেনকেও ফেরান মাত্র ৪ রানে। ৪১ রানেই তিন উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া তখন চাপে।

ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন স্টিভ স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন। চতুর্থ উইকেটে দু’জনের ৭৭ রানের জুটি অস্ট্রেলিয়াকে বিপদমুক্ত করার পথ দেখায়। বাংলাদেশকে ফের চাপে ফেলার মুহূর্তে জুটি ভাঙেন সেই শরিফুলই। ৭৪ বলে ৪২ রান করা স্মিথকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন তিনি। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক। আম্পায়ার্স কলে সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।

স্মিথ ফেরার পর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে আবার নামে ধস। মেহেদী হাসান মিরাজের বলে অ্যালেক্স ক্যারি ৫ রানে ফিরে যাওয়ার পর মাত্র তিন রানের মধ্যে চার উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। আর সেই ধসের মূল কারিগর হয়ে ওঠেন শরিফুল। পরপর বেউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ককে ফিরিয়ে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন। ওয়েবস্টার গোল্ডেন ডাক মেরে ফেরেন এলবিডব্লিউ হয়ে। রিভিউ নিয়েও সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেননি। এরপর কামিন্সকে লিটন দাসের ক্যাচ বানান শরিফুল। দুই বল পর বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে বড় কাঁটা স্টার্ককেও বোল্ড করেন।

মাত্র পাঁচ বলের মধ্যে তিন উইকেট। স্টার্ককেই যেন জবাব দিলেন শরিফুল। বাংলাদেশের ইনিংসে ৬ উইকেট নেয়া অস্ট্রেলিয়ান পেসারকে নিজের ষষ্ঠ শিকার বানিয়ে ম্যাকাইয়ের প্রথম দিনটাকে দুই পেসারের ব্যক্তিগত লড়াইয়ে পরিণত করেন বাংলাদেশের এই বাঁ হাতি।

শেষ পর্যন্ত ১১ ওভারে ৩৫ রান দিয়ে ছয় উইকেট নিয়ে দিন শেষ করেছেন শরিফুল। প্রথম দিন পতন হওয়া ১৮ উইকেটের ১২টিই গেছে স্টার্ক ও শরিফুলের দখলে। দুই পেসারের এমন দাপটে ব্যাটারদের জন্য ম্যাকাইয়ের পিচ যেন হয়ে উঠেছে আতঙ্কের জায়গা। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম ক্যামেরন গ্রিন। এক প্রান্ত আগলে রেখে ৮টি বাউন্ডারিতে ৫১ রানে অপরাজিত আছেন। নাথান লায়ন ১০ রানে তাকে সঙ্গ দিচ্ছেন। দু’জনের অবিচ্ছিন্ন জুটি প্রথম দিন পর্যন্ত ১৭ রান যোগ করেছে।

ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থা অস্ট্রেলিয়ার চেয়েও বাজে। মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে গেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। অসিদের হয়ে মাত্র ১২ রানেই ৬ উইকেট নেন মিচেল স্টার্ক। প্যাট কামিন্সের শিকার তিনটি। তাদের বোলিং খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে একইভাবে বল করার চেষ্টা করেছেন শরিফুল। এই চেষ্টায় সফল তিনি। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে শরিফুল জানালেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার পেসাররা বরাবরই খুব ভালো করে। ওদের বোলাররা লিজেন্ড। দেখছিলাম কিভাবে বল করলে বোলারদের জন্য বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়।’

নতুন বলের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে অল্পতেই আটকে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় ইনিংসে এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে অজিদের আরো কাবু করতে চান শরিফুল, ‘নতুন বলে সব সময়ই সুইং করেছে। ১৫-২০ ওভার পর্যন্ত সুইং করেছে। ওরা এই সুবিধা কাজে লাগিয়েছে। হয়তো পরবর্তীতে আমরাও এই সুযোগ কাজে লাগতে চেষ্টা করব।’

খেলা এখনো শেষ হয়নি

বাজে ব্যাটিংয়ের হতাশা কাটিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন শরিফুল। এই বোলারের কথায় স্পষ্ট, এখনো জিততে চায় বাংলাদেশ। এ জন্য ভালো সময়ের অপেক্ষায় বাংলাদেশ। ‘পাঁচ উইকেট পেলেও আমি স্বাভাবিক আছি। ম্যাচ জিতলে অনেক বেশি খুশি হব। চেষ্টা করব যেন আমরা দলগতভাবে খেলতে পারি এবং ম্যাচটা বের করে আনতে পারি। আমাদের ড্রেসিংরুমের বার্তা একটাই খেলা এখনো শেষ হয়নি, আমাদেরও সময় আসবে।’

প্রথম ইনিংসের বাজে ব্যাটিংকে খেলার অংশ বলেই মনে করছেন শরিফুল, ‘এটা শুধু আমাদের একটা খারাপ দিন ছিল। তবে শুধু আমাদেরই না, ওরাও (অস্ট্রেলিয়া) কিন্তু সংগ্রাম করছে। ইনশাআল্লাহ দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা ঘুরে দাঁড়াব। আমরা এখনো খেলায় আছি। চেষ্টা করব, দ্বিতীয় ইনিংসের পুরোটা যেন আমাদের হয়।’

শরিফুল যোগ করেন, ‘এখনো তো খেলা শেষ হয়ে যায়নি। প্রথম দিন গেল। ব্যাটিংয়ে আজ (গতকাল) আমাদের একটু খারাপ দিন গেছে। প্রতিপক্ষও তো অনেক সংগ্রাম করেছে। দেখা যাক, দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা কতটুকু ঘুরে দাঁড়াতে পারি।’