প্রথম দিনে ১৮ উইকেটের পতন
Printed Edition
ক্রীড়া প্রতিবেদক
ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনটি যেন ব্যাটারদের জন্য দুঃস্বপ্ন, আর পেসারদের জন্য উৎসব। মাত্র ৭৪ ওভারে পড়েছে ১৮ উইকেট, দুই দল মিলে রান করেছে ২২৯। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, ব্যাট-বলের লড়াইয়ে প্রথম দিনটি কতটা একপেশে ছিল বোলারদের দিকে। দ্বিতীয় দিনে প্রশ্ন একটাই- অস্ট্রেলিয়ার লিড কতটা বাড়বে
টস হেরে ব্যাটাররা যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন, তাতে ভুলে যাওয়ার মতো একটা দিনই পার করার কথা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু শুরুতেই প্রায় ছিঁড়ে যাওয়া আশার পালে হাওয়া লাগিয়েছেন বোলাররা। তাই বোলারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বাজে ব্যাটিংয়ের পরও লড়াইয়ে টিকে থাকার স্বপ্ন বুনছে সফরকারীরা।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিন শেষে ১০১ রানে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ৬৪ রানে অলআউটের পর অসিদেরও বেশ চাপে রেখেছে অতিথিরা। প্রথম দিনের খেলা শেষে ১৬৫ রানে স্বাগতিকদের ৮ উইকেট তুলে নিয়েছে তারা। এর মধ্যে ছয়টাই নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম। মূলত এই বাঁহাতি পেসারের ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়েই আশা বেঁচে আছে বাংলাদেশের।
টেস্টে এর চেয়ে কম রানে গুটিয়ে যাওয়ার রেকর্ড আছে বাংলাদেশের আরো তিনটি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২০১৮ সালে ৪৩, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২০২২ সালে ৫৩ ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০০৭ সালে ৬২ রানে থেমেছিল বাংলাদেশের ইনিংস।
বাংলাদেশের ইনিংস মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে দিতে ছয় উইকেট নিলেন মিচেল স্টার্ক। শরিফুল নিজের সামর্থ্যরে সেরাটা ঢেলে দেন দুর্দান্ত জবাব। ক্যারিয়ার সেরা স্পেলে তিনিও নেন ছয় উইকেট। অস্ট্রেলিয়া ১০০ ছাড়ানো লিড নিলেও ম্যাচে থাকল বাংলাদেশও। ৩৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের আশা জিইয়ে রাখার নায়ক শরিফুল।
অসিদের ভরসা হয়ে ক্রিজে আছেন ক্যামেরন গ্রিন। এই অলরাউন্ডার অপরাজিত ৫১ রানে। ১০ রান করে তার সঙ্গী নাথান লায়ন। দ্বিতীয় সেশনে ব্যাট করতে নামা অসিরা প্রথম উইকেট হারায় ২২ রানে। তাসকিন আহমেদের বলে ফেরেন ম্যাট রেনশো। এরপর বাকিটা শরিফুল-ঝলক। ট্রাভিস হেড ও মার্নাস লাবুশানেকে পর পর ফিরিয়ে ৪১ রানে ৩ উইকেট পান তিনি। চতুর্থ উইকেটে স্টিভেন স্মিথ-ক্যামেরন গ্রিন মিলে গড়েন ৭৭ রানের জুটি।
তখন মনে হচ্ছিল ব্যাট করার জন্য বেশ ভালো হয়ে গেছে উইকেট। দলের ভীষণ প্রয়োজনে নতুন স্পেলে ফিরেই সাফল্য পান শরিফুল। তার ইনস্যুইঙ্গার অফ স্টাম্পে পড়ে খানিকটা ভেতরে ঢুকছিল। স্মিথ শাফল করে সরে গিয়ে পায়ে লাগান। আম্পায়ার ধর্মসেনা আবেদনে সাড়া দেয়ায় রিভিউ নেন স্মিথ, তাতে দেখা যায় অল্পের জন্য তা আঘাত হেনেছে স্টাম্পে। মাঝে মেহেদী হাসান মিরাজের বলে আলেক্স ক্যারি আউট হলে পঞ্চম উইকেট হারায় অসিরা। এরপর বাউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ককে পরপর ফিরিয়ে দেন শরিফুল। ১৭ রানের জুটিতে দিনের শেষটা পার করেন গ্রিন-লায়ন।
এর আগে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের প্রথম ছয় ব্যাটারের চারজন আউট হন শূন্য রানে, দুই অঙ্কে যেতে পারেননি কেউ। মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্সের গোলা সামলে রান যা করার করলেন টেল এন্ডাররা। ৬৪ রানে গুটিয়ে যাওয়ার ইনিংসে সর্বোচ্চ রান করেন এগারো নম্বরে নামা শরিফুল। বাংলাদেশের ইনিংসের দুর্দশা তখনই স্পষ্ট। ডারউইনে ঐতিহাসিক জয়ে উড়তে থাকা বাংলাদেশ ম্যাকাইতে নামল মাটিতে। দ্বিতীয় টেস্টে দেড় সেশনেই শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস। ১২ রানে ৬ উইকেট নেন স্টার্ক, ২৫ রানে ৩ উইকেট নেন কামিন্স। হ্যাজেলউড নেন বাকি এক উইকেট।
লাঞ্চের পর ফিরে আর টিকতে পারেননি মিরাজ-হাসান কেউ। কামিন্সের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ১১ রানেই থামেন মিরাজ। হাসানও দুই অঙ্কে গিয়ে বিদায়। তাকে লেগ স্লিপের ফাঁদ পেতে শিকার ধরেন জশ হ্যাজেলউড। তাসকিন একবার ক্যাচ দিয়ে বাঁচার পর বাজে শটে ফেরেন ১ রান করে। বাংলাদেশ ৩৯ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে তখন টেস্টে নিজেদের ইতিহাসে সর্বনি¤œ রানে গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কায়, শরিফুল সেই লজ্জার রেকর্ড থেকে দলকে রক্ষা করেন ছোট্ট ক্যামিওতে।
টস জিতে বল হাতে স্টার্ক প্রথম বলেই ফেরান সাদমান ইসলামকে। তার বলে ফ্লিকের মতো করতে গিয়ে ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে আউট হন বাংলাদেশের ওপেনার। আরেক ওপেনার তানজিদ হাসান ব্যাট পেতে দিয়ে একইভাবে ক্যাচ। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এলবিডব্লিউ হওয়ার পর মুমিনুল হককেও স্লিপে ক্যাচ বানান স্টার্ক। লিটন দাস ক্যাচ দিয়ে বাঁচার পর শিকার হন এলবিডব্লিউর। ১২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে বাংলাদেশ।
এরপর কিছুটা সময় বিরতি। স্টার্ক আক্রমণ থেকে সরে গেলে যেন স্বস্তি পায় বাংলাদেশ। অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহীম ছিলেন থিতু হওয়ার চেষ্টায়। তবে তার প্রতিরোধ ভাঙেন প্যাট কামিন্স। মুশফিকের স্টাম্প উড়িয়ে দেন তিনি। ২১ রানে পড়ে ৬ উইকেট। তখনো কোনো ব্যাটারই দুই অঙ্কে যাননি। টেল এন্ডার হাসানকে নিয়ে প্রথম সেশনের বাকিটা পার করে দুই অঙ্ক স্পর্শ করেছিলেন মিরাজ। কিন্তু লাঞ্চ থেকে ফিরে দ্রুতই বিদায় নেন তারা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস : ৩৪ ওভারে ৬৪ (সাদমান ০, তানজিদ ০, মুমিনুল ৯, শান্ত ০, মুশফিক ৫, লিটন ০, মিরাজ ১১, হাসান ১০, তাইজুল ১১*, তাসকিন ১, শরিফুল ১৪, স্টার্ক ৬/১২, হ্যাজেলউড ১/২৮, কামিন্স ৩/২৫)।
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস : ৪০ ওভারে ১৬৫/৮ (হেড ২২, রেনশ ৮, লাবুশেন ৪, স্মিথ ৪২, গ্রিন ৫১*, ক্যারি ৫, ওয়েবস্টার ০, কামিন্স ০, স্টার্ক ১, লায়ন ১০*, তাসকিন ১/৪১, হাসান ০/৫৬, শরিফুল ৬/৩৫, তাইজুল ০/১৩, মিরাজ ১/৪)।
প্রথম দিন শেষে : অস্ট্রেলিয়া ১০১ রানে এগিয়ে।