নির্বাচনেই আছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার পরও বহু আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। গতকাল মঙ্গলবার শেষ দিনেও বেশ কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া এসব নেতাকে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে দেখছে দলটি। আর বিএনপির ‘বিদ্রোহীরা’ মনে করছেন, দল থেকে যে প্রার্থী দেয়া হয়েছে বা জোটের যে প্রার্থীকে বিএনপি সমর্থন দিয়েছে, তাদের চেয়ে তার নিজের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তারা নিজ এলাকার মানুষের অনুরোধে ভোটে আছেন। বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সামনে না আনলেও তাদের সাথে যোগাযোগ রেখে নির্বাচনী মাঠ সাজানোর চেষ্টা করছেন। বিএনপি বলছে, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিএনপির যেসব নেতা ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে’ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে রয়েছে, তাদের সংখ্যা খুব বেশি না। বিএনপির প্রত্যাশা- দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে বা সমঝোতার ভিত্তিতে জোটকে যেসব আসন ছেড়ে দিয়েছে, নেতাকর্মীরা তাকে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির পক্ষ থেকে তৃণমূলে এরই মধ্যে সেই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তৃণমূলের যেসব নেতা এই নির্দেশনা মানবে না, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিবে দল। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ছাড় দেবে না বিএনপি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিএনপির যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছে, আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কেউ কেউ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছে, সমঝোতা করেছে, পার্টির নির্দেশ মেনেছে। যারা দলের সিদ্ধান্ত মানেনি, তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের মতো কঠোর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে- সেটি আমরা করেছি। এর বেশি তো আর কিছু করার নেই। সংগঠন থেকে বহিষ্কারের পরে তো আর তাদের ব্যাপারে আমাদের দায়-দায়িত্ব থাকে না। তবে এদের সংখ্যা খুব বেশি না। তিনি আরো বলেন, আমাদের প্রত্যাশা- দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, নেতাকর্মীসহ সবাই মিলে তাকে বিজয়ী করতে কাজ করবে। আমরা তৃণমূলে এরই মধ্যে সেই নির্দেশনা দিয়েছি। আমরা মনে করি, সবাই বিএনপি মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করবে, দলের প্রতীকের পক্ষেই সিদ্ধান্ত দিবে।

তবে বিএনপির তৃণমূলের নেতারা জানান, দলের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে থাকায় স্থানীয় ইউনিটগুলোতে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে নির্বাচনী সমন্বয়ও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শরিকদের জন্য ১৭টি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী, নিবন্ধিত শরিকরা তাদের নিজেদের প্রতীকে আর অনিবন্ধিত শরিকরা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করছেন। অবশ্য বিজয় নিশ্চিতে কৌশলের অংশ হিসেবে শরিক কয়েকটি দলের নেতাদের বিএনপিতে যোগদান করিয়ে ধানের শীষ দেয়া হয়েছে। সমঝোতা অনুযায়ী, জোটের ৮ শীর্ষ নেতা ধানের শীষে ভোট করছেন। অন্য দিকে, নিবন্ধিত ছয়টি দলের ৯ জন নেতা তাদের নিজ নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করছেন। আসন ছেড়ে দেয়া ১২টি দলের মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ছাড়া বাকি দলগুলো আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক।

এ দিকে ধানের শীষ না পেয়ে নির্বাচনে শতাধিক আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন বিএনপি নেতারা। তবে তাদেরকে ধানের শীষ বা বিএনপি জোটের প্রার্থীর বিজয়ে ‘প্রতিবন্ধকতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠে থাকায় জটিল পরিস্থিতিতে পড়ে দল। তাই তাদের নির্বাচন থেকে সরাতে তথা প্রতিটি আসনে দলের একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালায় বিএনপি। দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরাতে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। কেন্দ্রের নির্দেশনায় অঞ্চলভিত্তিক বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাদের নির্বাচন থেকে সরানোর চেষ্টা চালান। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়। আর সর্বশেষ উদ্যোগ হিসেবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই ঢাকায় ডেকে কয়েকজনের সাথে কথাও বলেন। নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেন, একই সাথে ভবিষ্যতে যথাযথ মূল্যায়নেরও আশ্বাস দেন।

দেখা গেছে, তারেক রহমান কথা বলার পর অনেকেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতির জোনায়েদ সাকির বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত হওয়া দলের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল খালেক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ একে একরামুজ্জামান অন্যতম। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে জয়পুরহাট-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, ঝিনাইদহ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত শহীদুজ্জামান বেল্টুর স্ত্রী মুর্শিদা খাতুন (মুর্শিদা জামান পপি), মাদারীপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান পলাশ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ভোলা-১ আসন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বিএনপির প্রার্থী গোলাম নবী আলমগীর। এ আসনটি জোট শরিক বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি।

তবে বিএনপি চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাতের পরও স্বতন্ত্র হিসেবে ঢাকা-১২ থেকে দলের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব এবং ঢাকা-১৪ থেকে দারুস সালাম থানা বিএনপির আহ্বায়ক এসএ সিদ্দিক সাজু নির্বাচনে রয়েছেন। ইতোমধ্যে দু’জনকেই সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হককে ঢাকা-১২ আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। আর ঢাকা-১৪ আসনে সানজিদা ইসলাম তুলিকে ধানের শীষের প্রার্থী করেছে বিএনপি।

পটুয়াখালী-৩ আসনটি গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। তবে ধানের শীষ না পেয়ে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে রয়েছেন হাসান মামুন। দলীয় সিদ্ধান্ত না মানায় দলের কেন্দ্রীয় এই সদস্যকে এরই মধ্যে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।

জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী হাসান মামুন বলেন, মব সৃষ্টিকারীদের হাতে ভোট নেই, ভোট সাধারণ মানুষের হাতে। মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক সম্মান ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে যারা চেষ্টা করে, যারা সুখে-দুঃখে সবসময় মানুষের পাশে থাকে- সেটা বিবেচনায় নিয়ে মানুষ তাদেরকেই ভোট দেয়। সে কারণে তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনে যারা আমাকে বিজয়ী করবেন, সেই সাধারণ মানুষের মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিবেন, করণীয় ঠিক করবেন।

গণ অধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেয়া রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে রয়েছেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। এ জন্য গতকাল ফিরোজকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

সাইফুল ইসলাম ফিরোজ বলেন, ছাত্রজীবন থেকে শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ ধারণ করে দলের জন্য কাজ করেছি। ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির তিনজন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু মনোনয়ন দেয়া হয়েছে এমন একজনকে যিনি বিএনপির কেউ না। তিনি অন্য এলাকার, সাধারণ মানুষও তার সাথে নেই। নেতাকর্মী-সমর্থকদের দাবির মুখে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে কালীগঞ্জে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী-সমর্থকদের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলাম, এখনো আছি। কারণ, তারাই আমার ভরসা। স্থানীয় নেতাকর্মীদের বেশির ভাগই আমাকে স্বতন্ত্র নির্বাচনের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। নির্বাচনে বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকরা বিজয় নিয়েই ঘরে ফিরবেন।