আম্মু সারাক্ষণই জায়নামাজে বসে ছিলেন
Printed Edition
রফিকুল হায়দার ফরহাদ
পাঁছ বছর ধরে বয়সভিত্তিক সাফের শিরোপায় হাত ছোঁয়ানো হচ্ছিল না নাজমুল হুদা ফয়সাল, রিফাত কাজী, মোহাম্মদ মানিকদের। প্রতি আসরের মতোই এবারো এই ফুটবলারদের পণ ছিল শিরোপা তারা জিতেই হবে। গত ৩ এপ্রিল মালদ্বীপের মালে স্টেডিয়ামে সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে পোস্টের নিচে ইসমাইল হোসেন মাহিন এবং ফরোয়ার্ড লাইনে রোনান সুলিভানদের কল্যাণে। ভারতকে অনূর্ধ্ব-২০ সাফের ফাইনালে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশের। লাল-সবুজরা ট্রফি জয়ের সাথে পেয়েছে আরেকটি পুরস্কার। আর তা হলো সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার। এই ট্রফি দখলে নিয়েছেন গোলরক্ষক ইসমাইল হোসেন মাহিন। এবার তিনি ভারতের প্রথম টাইব্রেকার শটটি রুখে দিয়ে জয়ের ভিত্তি গড়েন। এরপর বাকি কাজ টুকু সারেন মোর্শেদ আলী, রোনান সুলিভানরা। লাল-সবুজ জার্সিতে প্রতিনিধিত্ব করার আগে পরিবারের বাধা টপকাতে হয়েছিল মাহিনকে। বাবা-মা কোনোভাবেই তাকে ফুটবলার হতে দিতে চাইছিলেন না। এখন বাবা-মা দারুণ খুশি ছেলের এই সাফল্যে। বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সাথে সাথেই মাহিনের কাতার প্রবাসী বাবা সেখানে মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন। আর মা তো পুরো ফাইনাল ম্যাচের সময়ই ছিলেন নামাজের বিছানায়। এরপর সবাইকে পায়েস রান্না করে খাইয়েছেন। জানান মাহিন।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার ছেলে মাহিন। তারা দুই ভাই। ছোট ভাই ফুটবলের সাথে নেই। লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত। অন্য দিকে মাহিন বিকেএসপির ছাত্র। সেখানে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে পড়ছেন। বাংলাদেশ প্রথমবার বয়সভিত্তিক সাফে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ২০১৫। সেবারও ভারতকে টাইব্রেকারে হারিয়ে। এবারো সেই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই কায়দায়। তবে ২০১৫ সালে খেলাতো দূরের কথা ফুটবল সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না মাহিনের। ২০১৬ সালে ফুটবল চর্চা শুরু। আন্তঃস্কুল ফুটবল খেলেই স্থানীয় কোচ আতিয়ারের চোখে পড়েন। এরপর কচি চাচাও নোট বুকে ঠাঁই দেন তাকে। দুইজনই তাকে ফুটবললার হতে উৎসাহ দেন। তবে পবিরার থেকে বাধা আসছিল। মাহিন জানান, আব্বু এবং আম্মু কোনোভাবেই চাইতো না আমি যেন ফুটবলার হই। বরং ভালো করে লেখাপড়া করতে চাপ দেন। এরই মধ্যে বিকেএসপিতে ট্রায়ালের ঘোষণা আসে। আমাদের এলাকার রুম্মন ও রাব্বী ভাই তখন বিকেএসপির ছাত্র। তারা আমার বাবা-মাকে বুঝাতে থাকেন। এরপর উনারা রাজি হলে আমি ট্রায়ালে যোগ দেই এবং টিকে যাই।’
এরপর ঘটে আরেক ঘটনা। মাহিনের দেয়া তথ্য, ‘আমার ভর্তি ছিল সিলেট বিকেএসপিতে। ২০১৬ সালের মার্চে সেই ভর্তির আগেই ফেব্রুয়ারিতে আব্বু কাতারে চলে যান। ঘরে আম্মা আর ছোট ভাই। তাই কোনোভাবেই এত অল্প বয়সে আমাকে সিলেটে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছিলেন না মা-বাবা। শেষ পর্যন্ত চাচাকে সাথে নিয়ে আম্মু আমাকে সিলেটে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসেন।’ সেই পথ চলায় ২০২১ সালে বাফুফের এলিট অ্যাকাডেমিতে চান্স পান। সেখান থেকে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে খেলা। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে চান্স পান মাহিন। তবে খেলা হয়নি। ২০২৪ সালে অনূর্ধ্ব-২০ সাফে চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য ছিলেন। তবে নেপালে যাওয়ার পরই প্রচন্ড জ¦রে আক্রান্ত হওয়ায় খেলার সুযোগ হয়নি। তবে গত বছর ভারতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ সাফে বাংলাদেশ দলের একনম্বর কিপার ছিলেন। সেই ফাইনালে মাহিন টাইব্রেকারে তৃতীয় শটটি রুখে দিলেও নাজমুল হুদা ফয়সাল ও শাহেদ মিস করায় চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত।
এবারের অনূর্ধ্ব-২০ সাফে মাহিন প্রথম শট রুখে দেয়ার পর সব ঠিক মতোই চলছিল। কিন্তু চতুর্থ শটে স্যামুয়েল রাকসামের শট ক্রসবারে লাগায় টেনশনে পড়ে যায় দল। সবার মধ্যেই দুশ্চিন্তা, এবারো না হতাশায় পুড়তে হয়। মাহিন জানান, স্যামুয়েল মিস করার পর টেনশন ছিলই। তবে আমার আত্মবিশ্বাস ছিল যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী রোনান সুলিভান গোল করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত রোনান গোল করেছেন। গোলের পর আমি খুব কান্না করেছিলাম। কারণ দলের মধ্যে আমি এবং চন্দন রায় ছাড়া আর কারোরই সাফ শিরোপা জয়ের স্বাদ নেই। আমি ও চন্দন ২০২৪ সালে অনূর্ধ্ব-২০ সাফের চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য।’ তার দেয়া তথ্য , অন্য সদস্যসরা পাঁচ বছর ধরে খেলে যাচ্ছে। কিন্তু অল্পের জন্য চ্যাম্পিয়ন হতে পারছিল না। ফলে তারাও খুব বেশি আবেগ আপ্লুত ছিল।’ তিন প্রবাসী রোনান, ডেক্লান ও নেওয়াজের প্রশংসা করে মাহিন বলেন, ওরা খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ।
মাহিন জানালেন, খেলা শুরুর আগে আমি আম্মুকে ভিডিও কল দিয়ে দেখি আম্মু নামাজের বিছানায়। আমাদের জয়ের জন্য দোয়া করছেন। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ফের কল দিয়ে দেখি তিনি তখনো জায়নামাজে। এরপর আব্বুকে কাতারে কল দিয়ে অনলাইনে পাইনি। পরে আব্বু কল ব্যাক করে জানিয়েছেন, তিনি খেলা শেষে বাসার বাইরে গিয়েছিলেন অন্যদের মিষ্টি খাওয়ানোর জন্য।
দুই বছর ধরে দেশের সেরা এবং বর্তমান লিগ চ্যাম্পিয়ন দল মোহামেডানে আছেন মাহিন। জাতীয় দলে ডাক পাওয়া সুজন হোসেন, সাকিব আল হাসানের কারণে মূল দলে খেলার সুযোগ নেই। আছেন তৃতীয় গোলরক্ষক হিসেবে। এর পরও গত বছর লিগে একটি ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়েছিল চট্টগ্রাম আবাহনীর বিপক্ষে। মাঠে ছিলেন ১০ মিনিট। তিনি নামার পর একটি পেনাল্টি হয়েছিল ডিফেন্ডারের হ্যান্ডবলের কারণে। সেই পেনাল্টি শট অবশ্য ঠেকাতে পারেননি মাহিন। যদিও দল জিতেছিল ৫-১।
বয়সভিত্তিক সাফে সেরা গোলরক্ষক হয়েই থেমে থাকতে চান না মাহিন। ক্লাব দলে নিয়মিত পোস্টের নিচটা আগলাতে চান। এরপর প্রতিনিধিত্ব করতে চান সিনিয়র জাতীয় দলে। তার এই ছোট্ট ফুটবল ক্যারিয়ারে সবচেয়ে স্মরণীয় এবারের সাফ শিরোপা জয়। তবে সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছিলেন গত বছর ফাইনালে ৯০ মিনিটের শেষ সময়ে সমতা আনার পর টাইব্রেকারে ভালো অবস্থানে থেকেও জিততে না পারায়।
মালেতে অনুষ্ঠিত এবারের ফাইনালে তার আশা ছিল তিনিই হবেন ফাইনাল সেরা। কিন্তু ম্যাচ কমিশনার ভারতের খেলোয়াড়কে সেই পুরস্কার দেয়ায় হয়েছেন বিস্মিত।