ফটিকছড়িতে অবৈধ মাটি বাণিজ্যে সিন্ডিকেটের দাপট
Printed Edition
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় অবৈধ মাটি উত্তোলন এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি পরিণত হয়েছে প্রভাবশালী একটি সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেটনির্ভর ব্যবসায়। নিয়মিত প্রশাসনিক অভিযান, মোবাইল কোর্ট ও লাখ লাখ টাকা জরিমানার পরও পাহাড়, খালপাড় ও উর্বর কৃষিজমি থেকে নির্বিচারে মাটি কাটা থামছে না। ইটভাটার লাইসেন্স বাতিল, যন্ত্রপাতি জব্দ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে এই শক্তিশালী মাটি সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিন দেখা গেছে, অভিযান চলাকালে মাটি কাটা বন্ধ থাকলেও প্রশাসন ফিরে যেতেই আবার আগের চিত্রে ফিরে যায় এলাকা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জরিমানাকে প্রতিরোধ হিসেবে না দেখে অনেকেই এটিকে ‘ব্যবসার খরচ’ ধরে নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। অভিযানের খবর আগেভাগেই পৌঁছে যাওয়ায় যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেয়া হয়, পরে ফের কাজ শুরু হয়।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে অবৈধ মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি বড় অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে প্রায় ২৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে হারুয়ালছড়ি ও বাংলাবাজার এলাকায় কৃষিজমির শ্রেণী পরিবর্তন করে মাটি কাটার দায়ে ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা, পাইন্দং ইউনিয়নের যোগিনাঘাটা ব্রিজ এলাকায় দুই ব্যক্তিকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা এবং ডিসেম্বর মাসে ফকিরাচান এলাকায় টপসয়েল কাটার দায়ে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
তবে স্থানীয়দের দাবি, এসব অভিযান স্থায়ী কোনো প্রভাব ফেলছে না। অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, অবৈধ মাটি উত্তোলনের সাথে জড়িত রয়েছে ইটভাটা মালিক, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও মাঠপর্যায়ের দালালচক্র। একটি জায়গার সীমিত অনুমতি দেখিয়ে আশপাশের একাধিক জমি ও খালপাড় থেকে দিনের পর দিন মাটি কাটা হচ্ছে।
ইটভাটা সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, একটি মাঝারি ইটভাটা প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১২০০ ঘনফুট মাটি ব্যবহার করে। প্রতি ঘনফুট মাটির দাম ৩০ থেকে ৫০ টাকা। এতে মাসে একটি ইটভাটায় ৭ থেকে ১৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়। ফটিকছড়িতে বর্তমানে অন্তত ২৫টির বেশি ইটভাটায় অবৈধভাবে উত্তোলিত মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে, যা মাসে কোটি টাকারও বেশি আর্থিক চক্র তৈরি করেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা জানান, কৃষিজমির টপসয়েল কেটে নেয়ায় ৫ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত স্বাভাবিক ফলন ফিরে আসে না। স্থানীয় কৃষক লোকমান বলেন, মাটি কেটে নেয়ার পর জমিতে ফসল আগের মতো হচ্ছে না, ক্ষতিপূরণও কেউ দেয় না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা নদী গবেষক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, হালদা নদীর তীরবর্তী এলাকায় অবৈধ মাটি উত্তোলন বন্ধ না হলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, অবৈধ মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।