প্রতিশ্রুতি ও দলীয় শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা শুরু

সরব নির্বাচনী মাঠ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হতেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন সরব হয়ে উঠেছে। প্রতিশ্রুতি, সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন ও ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক কৌশলে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে মাঠে নেমেছে বড় দল থেকে শুরু করে নতুন ও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিগুলো। আগামী দিনগুলোতে প্রচার-প্রচারণা আরো তীব্র হওয়ার আভাস মিলছে, যেখানে উন্নয়ন, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে চলবে তুমুল প্রতিযোগিতা। শেষ পর্যন্ত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটেই নির্ধারিত হবে এই রাজনৈতিক লড়াইয়ের চূড়ান্ত ফল।

ইসির আচরণ বিধিমালার ১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের আচরণ বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে ২৯৮টি আসনে চূড়ান্ত লড়াইয়ে রয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল। ইসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী বিএনপির ২৮৮ জন। জামায়াতে ইসলামী থেকে লড়ছেন ২২৪ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৩ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ২৪৯ জন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী সংখ্যা ১৯২, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩২ এবং এবি পার্টির ৩০ জন। দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগসহ সমমনা ৯টি রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।

নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদি হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে। বিশেষ করে সব দলের প্রার্থীরা নির্বিঘেœ মাঠে নামতে পারবে কি না এবং প্রচারে বাধার মুখে পড়বে কি না- এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে। পুলিশ, র‌্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সব নিরাপত্তা বাহিনী সমন্বিতভাবে মাঠে থাকবে এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন বা আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তাৎণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, অবাধ প্রচার ও নিরাপদ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’-বিএনপির প্রচার শুরু

ঢাকা, সিলেটসহ দেশের সর্বত্র নির্বাচনী প্রচারের সূচনা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী প্রচারের শুরুতেই গতকাল সিলেটে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেন- ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ-সবার আগে বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, দেশের মানুষই বিএনপির রাজনৈতিক মতার একমাত্র উৎস এবং জনগণের ভাগ্যোন্নয়নই দলের রাজনীতির মূল ল্য।

সিলেট নগরের সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান দেশবাসীর দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেন এবং ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে বিএনপিকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাস জানে এবং যারা দেশবিরোধী ভূমিকা রেখেছে, তাদের বিচার জনগণ ইতোমধ্যেই করে ফেলেছে।

এদিকে বিএনপির প্রচারে মূল প্রতিশ্রুতি হিসেবে উঠে এসেছে-নির্বাচিত হলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা। প্রচার কৌশল হিসেবে দলটি জনসভা, গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

প্রচারে নেমেছেন জামায়াত আমির

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছে দলের আমির ডা: শফিকুর রহমানের তিন দিনের কর্মসূচির মাধ্যমে। গতকাল তিনি নিজ নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ আসনে গণসংযোগে অংশ নেন। মিরপুর-১০ নম্বরের আদর্শ স্কুল মাঠে জনসভায় তিনি বক্তব্য দেন।

জামায়াত সূত্র জানায়, আজ শুক্রবার ও কাল শনিবার ডা: শফিকুর রহমান উত্তরবঙ্গ সফরে যাবেন। জামায়াতের প্রচারে ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে সমাজব্যবস্থা এবং বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হচ্ছে। দলটি মূলত গণসংযোগ, জনসভা এবং সামাজিক জমায়েতকে প্রচারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে।

কবর জিয়ারত ও পদযাত্রায় এনসিপির ব্যতিক্রমী সূচনা

ব্যতিক্রমী কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গতকাল সকালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং সদ্য শহীদ হওয়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন।

এরপর কাজী নজরুল ইসলাম ও ওসমান হাদির সমাধিসৌধের সামনে থেকে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ শীর্ষক একটি পদযাত্রা বের করা হয়। পদযাত্রাটি শাহবাগ মোড় হয়ে রমনা পার্কের সামনের সড়ক দিয়ে জাতীয় প্রেস কাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়। নাহিদ ইসলাম বলেন, ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জনগণের ভোটে বিজয়ী হবে এবং এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের পথ খুলবে।

এনসিপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে- বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ, রাজনৈতিক নিপীড়নের অবসান, তরুণদের নেতৃত্বে নতুন রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। দলটি পদযাত্রা, প্রতীকী কর্মসূচি ও সামাজিক আন্দোলনের ভাষাকে নির্বাচনী প্রচারের সাথে যুক্ত করছে।

আচরণ বিধিমালা ও ইসির কড়া বার্তা

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রচারকালে পোস্টার, মাইক ব্যবহার, যানবাহন শোভাযাত্রা ও ব্যয়ের েেত্র আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘন করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কমিশনের প থেকে বলা হয়েছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনী নিরাপত্তা উপলক্ষে গতকাল রাজধানীতে বিজিবির টহল দেখা গেছে।