সিজেপির আন্দোলনে ভারতের বৈশ্বিক ভাবমর্যাদায় ধস
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১০ বছরের শাসনামলে ভারতকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে তুলে ধরার যে বয়ান বা ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও আন্তর্জাতিক সূচক তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। গ্লোবাল পাসপোর্ট ইনডেক্স ২০২৬-এ ২০০ দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১২৫তম স্থানে নেমে এসেছে। নামিবিয়ার মতো ক্ষুদ্র দেশের পাসপোর্টও এখন ভারতের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। এমনকি হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সেও ২০১৪ সালের তুলনায় ভারতের অবস্থান বর্তমানে অনেক নিচে। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য বর্তমানে ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারতীয়দের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
এক সময় পর্যটনবান্ধব থাইল্যান্ডও ভারতকে তাদের ভিসা-মুক্ত তালিকা থেকে সরিয়ে দিয়েছে এবং বর্তমানে ভারতীয়দের জন্য ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও ফিরতি টিকিটের মতো কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। ৯৩টি দেশ থাইল্যান্ডে ৩০ দিনের জন্য বিনা ভিসায় ভ্রমণের সুবিধা পেলেও ভারতকে এখন আজারবাইজান, বেলারুশ ও সার্বিয়ার মতো দেশগুলোর সাথে ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। আমেরিকা ও কানাডায় ভারতীয় ছাত্রদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর কানাডায় এই হার ৭৪ এবং আমেরিকায় ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। কানাডায় ভারতীয়দের ভিসা প্রসেসিং সময় এখন ৯৯ দিন পর্যন্ত পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের জন্য এই সময় মাত্র ৫৯ দিন। ভারতীয় ছাত্রদের এফ ওয়ান ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ২৩ থেকে গত বছর বেড়ে ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। প্রতি ১০ জন ভারতীয় ছাত্রের মধ্যে ছয়জনের আবেদনই বাতিল হয়। এর তুলনায় ইউরোপীয় ছাত্রদের এই হার মাত্র ৯ শতাংশ।
অথচ মোদি গত ১২ বছরে ৩৩টিরও বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, যা তাকে বিশ্বের অন্যতম সমাদৃত নেতায় পরিণত করেছে। অনেক পুরস্কারই তার সফরের ঠিক আগে তৈরি করা। সেচেলসের দেয়া একটি পুরস্কারের সার্টিফিকেটে বানান ভুল এবং এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের লক্ষণ পাওয়া গেছে। সমালোচকদের মতে, এই ব্যক্তিগত সম্মান ভারতের সাধারণ মানুষ, ছাত্র বা ব্যবসায়ীদের বৈশ্বিক অধিকার বা সুবিধা বৃদ্ধিতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না।
পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রভাব বাড়ছে বলে দাবি করা হলেও, বাস্তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো ভারতের অনেক সিদ্ধান্তে (যেমন : রাশিয়ার তেল বা ইরানের চাবাহার বন্দর) প্রভাব বিস্তার করে। আন্তর্জাতিক অপরাধী যেমন লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হচ্ছে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। লাদাখ ও অরুণাচল সীমান্তে চীনের অনুপ্রবেশ ভারতের বৈদেশিক নীতির সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করছে।
অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও জনমত
ভারতের অর্থনৈতিক টানাপড়েন, বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করছে। তথাকথিত ‘বিশ্বগুরু’র ভাবমর্যাদা মূলত মোদি সমর্থিত সোস্যাল মিডিয়া ও নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে প্রচার করা হয়, যার সাথে বাস্তব তথ্যের অমিল রয়েছে। একই সাথে ভারতের পাসপোর্ট সূচকের নি¤œগতি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। প্রকৃত আন্তর্জাতিক সম্মান কেবল ব্যক্তিগত পুরস্কারের মাধ্যমে নয়, বরং ভারতের নাগরিকদের বৈশ্বিক মর্যাদা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব।
ভারতকে ‘রিজেকশন গুরু’ বলা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা আবেদনের প্রত্যাখ্যানের হার এবং পাসপোর্ট সূচকে দেশটির অবস্থান উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে। পর্যটন, ছাত্র বা ওয়ার্ক সব ধরনের ভিসার ক্ষেত্রে ভারতীয় আবেদনকারীদের প্রত্যাখ্যানের হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। শুধু শেনজেন ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় এক বছরে ভারতীয়দের ১৩৩.৫ কোটি রুপি লোকসান হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয় ছাত্রদের ভিসার সংখ্যা প্রায় ৪৮ শতাংশ কমে গেছে। মাত্র ২৬টি দেশে ভারতীয়রা ভিসা-মুক্ত ভ্রমণের সুবিধা পাচ্ছে, যার বেশির ভাগই ছোট দ্বীপরাষ্ট্র বা প্রতিবেশী দেশ। বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে দাবি করা হলেও ভারত তার নাগরিকদের জন্য উন্নত দেশগুলোতে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ভারতের তুলনায় মাত্র ২ শতাংশ জিডিপি ও ২৬ লাখ জনসংখ্যার দেশ নামিবিয়া এই মানদণ্ডগুলোতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ভারতীয় ছাত্রদের এফ ওয়ান ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ২৩ থেকে গত বছর বেড়ে ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। প্রতি ১০ জন ভারতীয় ছাত্রের মধ্যে ছয়জনের আবেদনই বাতিল হয়। এর তুলনায় ইউরোপীয় ছাত্রদের এই হার মাত্র ৯ শতাংশ।
ভারত থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র পরিচালনা
ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কারাগার আহমেদাবাদের সবরমতি সেন্ট্রাল জেল থেকে এক বন্দী গত জানুয়ারিতে এনক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পাঠায় লস এঞ্জেলসে। ওই বার্তায় সেই বন্দী দাবি করে ৫০ লাখ ডলার দিতে হবে। এরপর ভারতের একটি কারাগার থেকে কিভাবে তিনটি মহাদেশ জুড়ে চাঁদাবাজি, জুয়া ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপকর্ম পরিচালিত হচ্ছে তা এফবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে। গত ৭ জুলাই মার্কিন বিচার বিভাগ এক সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযান চালানোর কথা প্রকাশ করে যে, অভিযানে ৩৭ জনের এক অপরাধ চক্রের মধ্যে ২৪ জনকে গ্রেফতারের কথা জানানো হয়। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে হাজার কেজি কোকেন, ১২টা আগ্নেয়াস্ত্র ও চার লাখ ডলার উদ্ধার করা হয়েছে। এ ধরনের তিনটি সঙ্গবদ্ধ অপরাধী চক্রের শিকড় ভারতে কিন্তু তারা বিভিন্ন দেশে অপরাধ পরিচালনা করে আসছে।
২০২৩ সালে কানাডার সারে শহরে এক শিখ মন্দিরের ঠিক বাইরে হরদীপ সিং নিরজার নামে এক ব্যক্তিকে খুনের নির্দেশ দেয় বিষ্ণয়ী। কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো একবার প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছিলেন নিরজার হত্যায় ভারত সরকারের এজেন্ডরা জড়িত। তিন বছর পর আমেরিকার বিচার বিভাগ আর কানাডার পুলিশ বলছে ওই অভিযান বিষ্ণয়ী সবরমতি জেলের সলিটারি সেল থেকে চোরাই মোবাইল আর ভিউ আইপি ডিভাইসের সাহায্যে পরিচালনা করা হয়। ভারতীয় অপরাধ সিন্ডিকেট ছড়িয়ে আছে কানাডা, আমেরিকা, ব্রিটেন, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত। এদের সদস্য সংখ্যা ৮০০। অথচ ভারত সবসময় সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদ বলে মুসলমানদের ঘাড়ে দোষ চাপায়। ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনকে শুরুতে বিদেশী সন্ত্রাসবাদের এজেন্টদের কর্মকাণ্ড বলে অভিহিত করা হচ্ছিল।
আন্তর্জাতিক আস্থার অভাব
বিশ্বের অনেক দেশ এখন ভারতীয় নাগরিকদের সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছে। ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা এই নি¤œ গতির জন্য দায়ী। ভারতে জীবনযাত্রার মান, আন্তর্জাতিক মহলে সাধারণ নাগরিকদের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাই ভারতীয় নাগরিকদের জন্য শেনজেন ভিসা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের সত্যিকারের বন্ধুর সংখ্যা কমে আসছে। প্রতিবেশী দেশের উন্নয়নকে ভারত অনেক সময় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে মনে করছে। আমেরিকা ও ইরানের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক থাকলেও পাকিস্তানকেই তাদের শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। নেপাল ও ভুটানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো ভারতীয়দের জন্য ভিসা-মুক্ত যাতায়াতের সুবিধা দিলেও, ভারতের পাসপোর্ট এখন মালদ্বীপের মতো ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের চেয়েও দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভের ব্যর্থতা
আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিবেশী বা বন্ধুদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন আদায় করতে পারছে না ভারত। ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর মতো প্রচেষ্টার পরেও একটি দেশও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সুরে সুর মিলিয়ে নাম ধরে নিন্দা জানায়নি। বন্ধুত্বের দাবি সত্ত্বেও আমেরিকা ভারতের বাণিজ্য ও জ্বালানি নীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করে। ভারতীয় পণ্যসামগ্রীর ওপর আমেরিকার শুল্ক আরোপও এই বন্ধুত্বের সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করেছে।
সন্দেহপ্রবণ দৃষ্টিভঙ্গি
অনেক দেশ ভারতকে সন্দেহের চোখে দেখে, যার প্রভাব সাধারণ নাগরিকদের ভিসা পাওয়ার ওপর পড়ছে। মার্কিন নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হৃদ্যতা থাকলেও, যখন বাণিজ্যিক শুল্ক বা ভিসার মতো বাস্তব নীতির বিষয় আসে, তখন ভারত কোনো বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে না। বরং আমেরিকা ভারতীয় পণ্য ও নাগরিকদের ওপর কড়াকড়ি বজায় রাখছে।
সীমান্তে চীনের ক্রমাগত হস্তক্ষেপকে ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি এবং মোদি সরকারের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও সামর্থ্য ঘাটতির একটি বড় প্রমাণ। মোদি সরকার ভারতের বিদ্যুৎ খাতে চীনা বিনিয়োগে অনুমতির চিন্তাভাবনা করছে, যা কূটনৈতিকভাবে ভারতের একটি দুর্বল ও স্ববিরোধী অবস্থানকে ফুটিয়ে তোলে। বিশ্বমঞ্চে ভারতের যে ‘ঐতিহ্য’ বা ‘দাপট’এর কথা বলা হয়, সীমান্ত সমস্যাটি তার ঠিক উল্টো চিত্র তুলে ধরছে।