১৩ বছর পর আত্মসমর্পণ করলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

Printed Edition
back-2
১৩ বছর পর আত্মসমর্পণ করলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

ফরিদপুর প্রতিনিধি

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আত্মসমর্পণ করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়েছেন।

গতকাল সকালে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হন। তার আগে মঙ্গলবার তিনি ট্রাইব্যুনালে সাজা মওকুফের আবেদন করেন। গত ৮ জুলাই এই মামলায় সাজা স্থগিত চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। এ সময় তিনি বিদেশ থেকে দেশে ফিরেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার আবেদনের ওপর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে মতামত চেয়ে পাঠান। আইন মন্ত্রণালয় ১৮৯৮ সালের ৫ ধারা ৪০১ (১) এর ক্ষমতাবলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ডাদেশ এক বছরের জন্য স্থগিত করেন।

গত ২২ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (কারা-২) শাখা থেকে জারি করা এক আদেশে সাজা স্থগিতের বিষয়টি জানানো হয়েছিল। আদেশে তার বিরুদ্ধে প্রদত্ত দণ্ডাদেশ আদালতে আত্মসমর্পণপূর্বক আপিল দায়েরের শর্তে এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। সরকারি এই আদেশের ফলে মাওলানা আবুল কালাম আজাদকে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার আগে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এরপর তিনি আপিল করতে পারবেন বলে আদেশে বলা হয়। মাওলানা আবুল কালাম আজাদকে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল-২ এর তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ওই সময় থেকে তিনি পলাতক।

আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে সাতটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তিনটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি চারটি অভিযোগে কারাদণ্ডের সাজা দেয়া হলেও মৃত্যুদণ্ডের সাজা হওয়ার কারণে আলাদা করে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়নি। একটি অভিযোগ প্রমাণের অভাবে খারিজ করা হয়।

আবুল কালাম আজাদের এ রায়ই ছিল যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কিত প্রথম মামলার রায়। তবে রায় ঘোষণার সময় তিনি পলাতক ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আগেই তিনি দেশত্যাগ করেন। গত বছর তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাজা স্থগিতের আবেদন করার আগে তিনি দেশে ফিরেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত এই মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা চলে যান। সেখানে তিনি ছেলের কাছে থাকতেন। গত বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাজা মওকুফের আবেদন করার আগে তিনি দেশে ফিরে তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বড়খারদিয়া গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।

আপিলের পথ খুলল ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা আজাদের

নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে রায়ের সত্যায়িত অনুলিপিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার আদেশ পেয়েছেন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। একইসাথে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তার সাজা স্থগিতের আদেশ বহাল থাকবে।

গতকাল বুধবার বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। অপর সদস্যরা হলেন, বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এদিন ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন মাওলানা আজাদ। পরে আপিলের জন্য রায়ের সত্যায়িত অনুলিপিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদন করেন তিনি। তার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মশিউল আলম। ট্রাইব্যুনালকে আইনজীবী বলেন, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মাওলানা আজাদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। এ নিয়ে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আমরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে দেয়া তার রায়ের সত্যায়িত অনুলিপিসহ এ মামলার প্রয়োজনীয় সব ধরনের কাগজপত্র পেতে আবেদন করছি। শুনানি শেষে তার আবেদন মঞ্জুর করে আপিলের জন্য যাবতীয় সব কাগজপত্র দেয়ার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় থাকবে বলে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে।

আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি তার ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। পলাতক থাকা অবস্থায় তার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়। তবে নিজের সাজা স্থগিত চেয়ে গত বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন তিনি। পরে তার সাজা স্থগিত করা হয়।