অপতথ্যে সয়লাব সোশ্যাল মিডিয়া
Printed Edition
আবুল কালাম ও আমিনুল ইসলাম
- রাজনীতিবিদদের চরিত্র হরণ
- নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ
- রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতার চেষ্টা
সত্য মিথ্যের মিশেলে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা। প্রতি মিনিটেই চলছে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চরিত্রহরণ, বিভাজন, নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, ভুয়া তথ্যে মানহানিকর ও চরিত্র হরণের লড়াই। অসত্য, বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক মিথ্যে প্রোপাগান্ডা থেকে বাদ যাননি রাজনৈতিক ব্যক্তি, সরকার, জনপ্রতিনিধি, সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাও।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশবিরোধী ও অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও অনলাইনে পুরনো মিছিলের ভিডিও, এআই কনটেন্ট আর ইস্যুভিত্তিক নানা অপতথ্যের প্রচারে এখনো সক্রিয় ভূমিকায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। হাসিনাও বসে নেই, গদি হারানোর প্রতিশোধ হিসেবে তিনি দেশের সরকার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হুমকি ধমকি অব্যাহত রেখেছেন। ধারণা করা হচ্ছে ৯৮ শতাংশ অপতথ্য নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মাধ্যমে হচ্ছে।
অন্য দিকে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে এআই প্রযুক্তির ফেক কনটেন্ট ছড়িয়ে মাঠে সরব থাকা রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে ঘায়েলের বিপজ্জনক ও নোংরা প্রতিযোগিতায় মেতেছে। দেশের বৃহত্তম দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দেশের বাইরে থেকে জামায়াতে ইসলামীকে বিতর্কিত করতে সবচেয়ে বেশি অপপ্রচার করছে ভারতীয় মিডিয়া। এ ছাড়া ফেসবুক ও ইউটিউবে একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে নানান বিষয়ে মিথ্যা তথ্য ও মানহানিকর গুজব, উসকানি, বিএনপি জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলের নেতাদের চরিত্র হরণে নেতিবাচক কনটেন্ট ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে জনমনে বিভ্রান্তি, উত্তেজনা ছড়িয়ে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট ও নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘটছে হত্যা- খুনের মতো ঘটনাও।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুরুতে ফেসবুকে তর্ক-বিতর্ক, আলাপ আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল সাইবার যুদ্ধ। কিন্তু সময়ের সাথে তা সবার কাছে এখন আতঙ্কের প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে অনলাইনকেন্দ্রিক প্রোপাগান্ডা, মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করাটা এখন সুস্থ রাজনীতির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার বলছে, গত বছর সোশ্যাল মিডিয়ায় মোট ৪১৯৫টি মিথ্যা কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতি বিষয়ের কনটেন্ট ছিল দুই হাজার ২৮১টি, যা অন্য সব ক্যাটাগরি থেকে বেশি। আর শুধু ডিসেম্বরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সবচাইতে বেশি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ৪৪৬টি। অন্তর্বর্তী সরকারকে জড়িয়ে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে ৪৬৪টি। যা আগের বছর ২৪ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। এর বাইরে ওসমান হাদি হত্যা ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছাড়ানো হয়েছে। এসব কনটেন্ট তৈরিতে এআই-ডিপফেকের ব্যবহার বেড়েছে ৪০৯ শতাংশ। ভুয়া ফটোকার্ডের ব্যবহার বেড়েছে ৪৭ শতাংশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ছাড়াও গণমাধ্যমও ভুল তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। গত বছর দেশের গণমাধ্যমগুলোতে প্রচারিত প্রতিবেদনে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ১১০টি। জাতীয় পর্যায়ের ভুয়া তথ্যের সংখ্যা ৮১৯টি, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিকবিষয়ক ভুয়া তথ্য পাওয়া গেছে ৩৭৪টি।
দেশে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য হয়েছে জামায়াত ও বিএনপিকে জড়িয়ে। বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৭০২টি, আর দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জড়িয়ে এই সময়ে ১০৯টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। অন্য দিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৫৮৯টি এবং দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ৫১টি মিথ্যে তথ্য প্রচার হয়েছে। এর বাইরে জাতীয় নাগরিক পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও গণ অধিকার পরিষদকে জড়িয়ে অসংখ্য ফেক তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
বাদ যায়নি রাষ্ট্রও। সরকার ও সরকারের উপদেষ্টাদের জড়িয়ে ৪৬৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সরকারকে জড়িয়েই ভুল তথ্য ছড়িয়েছে ১০৭টি। আর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জড়িয়ে সর্বাধিক ৯৬৬টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। যার ৯৩ শতাংশই আওয়ামী লীগের পক্ষে। আর দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে এই সময়ে প্রকাশ করা ২৭৩টি অপতথ্যের ৮৮ শতাংশই তার পক্ষে প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।
অপর দিকে ভারতীয় গণমাধ্যমেও বাংলাদেশী নারীদের নিয়ে ‘ভুয়া সংবাদ’ পরিবেশন করা হয়। যার ৫৪ শতাংশই রাজনৈতিক। এসব অপতথ্যের কোনোটিতে ডাকসু নির্বাচনের নারী প্রার্থী, নারী নেত্রী, মুসলিম নারীকে হিন্দু এবং মেয়েদের জন্য বাধ্যতামূলক হিজাব পরিধানের জন্য স্লোগান তোলা সংক্রান্ত দাবির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিরাজমান পরিস্থিতিতে যদিও গত সপ্তাহে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার থেকে বিরত না থাকলে রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো তার দৃশ্যমান কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী ক্ষমতার লোভে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে এমন নোংরা কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ফিফোটেকের মাধ্যমে ভাড়াটে লোক দিয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অপতথ্য প্রচার করেছিল। এখন সেই মাধ্যম দিয়ে একই কাজ করছে একটি বিশেষ চিহ্নিত দল, যা আমাদেরকে সাময়িক সমস্যায় ফেলছে।
তিনি বলেন, বিএনপি অবাধ তথ্যপ্রবাহে বিশ্বাসী। তথ্যভিত্তিক, বস্তুনিষ্ঠ, গঠনমূলক আলোচনায় কারো কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সত্য ও বাস্তব তথ্য এখন ভুল তথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের সাথে মিশে যাচ্ছে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও অপব্যবহারের ভাড়াটে বট বাহিনী ভুল তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চলাচ্ছে। এর মোকাবেলায় বিএনপি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। মিথ্যার বিপরীতে সত্য তুলে ধরতে কাজ করছে। কিন্তু সরকার ও তার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব বন্ধে নীরব ভূমিকা পালন করছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
অপর দিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের নয়া দিগন্তকে বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচাইতে বেশি অপতথ্যের শিকার জামায়াতে ইসলামী। তারপরও আমরা কারো প্রতি অপতথ্য না ছড়িয়ে ধৈর্যের সাথে নীতি নৈতিকতার মধ্যে তা মোকাবেলার চেষ্টা করছি। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে কে কোথা থেকে কী করছে তা বুঝা মুশকিল। ফলে আমরা ভয়ানক আক্রমণের শিকার হয়েও তার প্রতিরোধ বা প্রতিকার করতে পারছি না। একান্ত যেখানে জবাব না দিলে বা না করলে না হয় ততটুকুই জবাব দিচ্ছি বা করছি। কারণ আমরা ইসলামী মূল্যবোধ ও ধৈর্যধারণে বিশ্বাসী।
বিষয়টি নিয়ে সরকারের পদক্ষেপের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেসসচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে সরকার কাজ করছে। আমরা ফেক কনটেন্ট শনাক্তে একটি পেজ খুলে সেখান থেকে সঠিক তথ্য সরবরাহ করছি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর পিআইবি, আইসিটি ও বিটিআরসি, সেই সাথে বেসরকারি সংস্থা ও রাজনৈতিক দলগুলোও অপতথ্য চিহ্নিতে কাজ করছে। এভাবে সবাই মিলে কাজ করলে এক সময় তা নিয়ন্ত্রণে আসবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে সাইবার হামলা প্রতিহত করতে সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে আমাদের সাইবার মনিটরিং ইউনিট। এদের কাজ সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং করা। ফলে নির্বাচনকেন্দ্রিক অথবা রাষ্ট্রীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা যেকোনো ভুয়া কনটেন্ট বা কোনো পোস্ট ছড়ালে সেটি মনিটরিং করা হয়। এরপর মনিটরিং সেলের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট টিমকে রিপোর্ট দিয়ে থাকে। তাদের দেয়া ওই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে অপারেশন চালানো হয়। এ ছাড়াও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পেলেও সেগুলো তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়।
অপরদিকে আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া তথ্য ছড়ানো ঠেকাতে ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ফেসবুক ও ইউটিউব কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা হয়েছে। ওই আলোচনায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির সাথে আমিও উপস্থিত ছিলাম।
তার ভাষ্য, ফেসবুক ইউটিউব কর্তৃপক্ষ নির্বাচনকেন্দ্রিক ভুয়া কনন্টেন বা তথ্য প্রচারের বিষয় মনিটরিং করে তা বন্ধ করবে বলে সম্মতি জানিয়েছে। শুধু তাই নয়, এআই ব্যবহৃত পোস্টসহ দ্রুত সময়ের মধ্যে শনাক্ত করে সেটি বন্ধ করার ব্যাপারেও কথা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে এখনো চুক্তি সই হয়নি। এটা বাস্তবায়ন হলে ভুয়া তথ্য প্রচার ৯০ ভাগ কমে যাবে। বাকি ১০ ভাগের বিষয়েও সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।