জুলাই বিপ্লবে সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা তদন্তের আবেদন আইসিটিতে
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা তদন্তের আবেদন জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে দু’টি পৃথক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
প্রথম অভিযোগটি দাখিল করেন রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াশ। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সম্ভাব্য আইনি দায় রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরেও তার ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়।
অভিযোগে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়কে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ, তদন্ত পরিচালনা এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
এ দিকে, বাংলাদেশ আজাদ পার্টিও (বিএপি) একই বিষয়ে পৃথক একটি অভিযোগ দাখিল করেছে।
অভিযোগ জমা দেয়ার পর দলের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হন। তার ভাষ্য, ‘দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকেও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি; তিনি নীরব ছিলেন।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, তার কার্যালয়ে রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম ও বাংলাদেশ আজাদ পার্টির পক্ষ থেকে দু’টি অভিযোগ জমা পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি এখনো অভিযোগগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করিনি।’
উল্লেখ্য, অভিযোগ দায়ের করা হলেও এগুলো এখনো তদন্তাধীন এবং এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল কোনো সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ দেয়নি। অভিযোগে উত্থাপিত দাবিগুলো এখন পর্যন্ত আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা নিজেই অপরাধ প্রমাণের সমান নয়। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তবেই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এগোতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের একাধিক আইনজীবীর মতে, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ কার্যক্রম মন্ত্রিসভার পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। ফলে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করতে হলে তদন্তে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা, নির্দেশ, সহায়তা বা ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তার সাথে সংঘটিত অপরাধের আইনি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশ্লেষকদের ভাষ্য, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শুধু কোনো সাংবিধানিক পদে থাকা যথেষ্ট নয়; প্রসিকিউশনকে দেখাতে হবে যে অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, অথবা অপরাধ সম্পর্কে জেনেও তা প্রতিরোধে আইনগত দায়িত্ব পালন করেননি কিংবা অপরাধে সহায়তা বা উৎসাহ দিয়েছেন। এসব বিষয় প্রমাণের দায় সম্পূর্ণভাবে প্রসিকিউশনের ওপর বর্তায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্তে যদি অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া যায়, তাহলে অভিযোগ খারিজও হতে পারে। আবার পর্যাপ্ত প্রমাণ মিললে ট্রাইব্যুনালের প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। তাই অভিযোগ দায়েরের ঘটনাকে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।