প্রবৃদ্ধি ক্রমেই কমছে স্বস্তি শুধু রেমিট্যান্সে

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

  • জিডিপি নেমেছে ২.২২ শতাংশে
  • শিল্পে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি; মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণ ও বিনিয়োগ সঙ্কটে বাড়ছে অর্থনীতির চাপ

বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে এক দিকে প্রবৃদ্ধির গতি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, অন্য দিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তুলছে। কৃষি, শিল্প ও সেবা- অর্থনীতির তিনটি প্রধান চালিকাশক্তিই গতি হারিয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং খেলাপি ঋণের বোঝা নতুন রেকর্ডে পৌঁছেছে। তবে এই অস্বস্তির মধ্যেও রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স, বৈদেশিক লেনদেনে উদ্বৃত্ত এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল বিনিময় হার অর্থনীতিকে বড় ধরনের সঙ্কট থেকে রক্ষা করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংল প্রকাশিত তৃতীয় প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) প্রতিবেদনে অর্থনীতির এমন চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৃতীয় প্রান্তিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু সাময়িক প্রবৃদ্ধি হ্রাসের নয়; বরং অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। উৎপাদন কমছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল, কর্মসংস্থানের গতি শ্লথ এবং মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ চাহিদাও চাপের মুখে পড়েছে।

প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিনে একযোগে ধাক্কা

চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২.২২ শতাংশে। এর আগের প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.০৩ শতাংশ, প্রথম প্রান্তিকে ৪.৯৬ শতাংশ এবং আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪.৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ পুরো অর্থবছরজুড়েই প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়; বরং উৎপাদন, ভোগ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর একযোগে চাপের বহিঃপ্রকাশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অর্থনীতির তিনটি প্রধান খাতই মন্থর হয়েছে। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৩.৬৮ শতাংশ থেকে কমে ১.৭৪ শতাংশে নেমেছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের বাজার অস্থিতিশীলতা এবং প্রণোদনার সীমিত প্রভাব এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ৪.৪৫ শতাংশ থেকে কমে ৩.৫২ শতাংশ হয়েছে। ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া, পরিবহন, বাণিজ্য ও আর্থিক কার্যক্রমে ধীরগতি এর অন্যতম কারণ। আর শিল্প খাতে দেখা দিয়েছে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ০.২৮ শতাংশ। বিশেষ করে উৎপাদনশীল শিল্পে (ম্যানুফ্যাকচারিং) নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেশের রফতানি ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পুরো অর্থবছরে ৪.১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক পূর্বাভাস দিয়েছে, তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ আসছে নিম্ন ভিত্তি থেকে; অর্থনীতির প্রকৃত গতি এখনো দুর্বল।

মূল্যস্ফীতির চাপে ভোক্তা

এ দিকে প্রবৃদ্ধি কমলেও মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি। মার্চ ২০২৬-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৭১ শতাংশে। ডিসেম্বর শেষে এটি ছিল ৮.৪৯ শতাংশ। রমজান ও ঈদ উপলক্ষে চাহিদা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘিœত হওয়ায় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়েছে।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। মাছ, গোশত, ফল, শাকসবজি ও মসলার দাম সাধারণ মানুষের ব্যয় আরো বাড়িয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.০৯ শতাংশ হলেও তা মূল্যস্ফীতির নিচে। অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে এবং ক্রয়ক্ষমতা আরো দুর্বল হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোগব্যয় ও অভ্যন্তরীণ বাজারে।

কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাব

এ দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসুদ ১০ শতাংশে বহাল রেখেছে। কঠোর মুদ্রানীতির ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ৪.৭২ শতাংশে নেমেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সর্বনিম্ন হার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৮.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু উচ্চ সুদের হার নয়; খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগে আস্থার সঙ্কট এবং বৈশ্বিক ঝুঁকিও উদ্যোক্তাদের নতুন ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহিত করছে। অন্য দিকে সরকার রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নেয়ায় সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩১.৫১ শতাংশে পৌঁছেছে।

রাজস্ব কমেছে, ব্যয়ও কমেছে

সরকারের রাজস্ব আদায় ৪.২৮ শতাংশ কমেছে। এনবিআর বহির্ভূত কর ও করবহির্ভূত আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় রাজস্বে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সময়ে সরকারি ব্যয় ৩.৪৫ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং এডিপি ব্যয় কম হওয়ায় অর্থনীতিতে সরকারি ব্যয়ের ইতিবাচক প্রভাবও সীমিত থেকেছে। ফলে বাজেট ঘাটতি কিছুটা কমে ৪৬৩.৬১ বিলিয়ন টাকায় নেমেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে বাজেট ঘাটতি কমানো দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক নয়।

রেমিট্যান্সই সবচেয়ে বড় শক্তি

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক খবর এসেছে বৈদেশিক খাত থেকে। তৃতীয় প্রান্তিকে দেশে এসেছে ৯.৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক প্রবাসী আয়। এই অর্থ বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়েছে, চলতি হিসাবকে ১৮৯ মিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্তে নিয়ে এসেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ, বাণিজ্য ঋণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের প্রবাহও বেড়েছে।

ফলে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য উদ্বৃত্তে রয়েছে এবং টাকার বিনিময় হারও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল আছে।

ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি এখনো বড়

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো মোট খেলাপি ঋণের হার ৩২.২৬ শতাংশে পৌঁছানো। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মূলধন ঘাটতি, দুর্বল মুনাফা, দীর্ঘ দিনের সুশাসনের সঙ্কট এবং দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি আরো বাড়াচ্ছে। যদিও আমানত প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল রয়েছে এবং অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে, বিশ্লেষকদের মতে এটি সুস্থ ঋণপ্রবাহের লক্ষণ নয়; বরং ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ার প্রতিফলন।

পুঁজিবাজারে আশার আলো

দীর্ঘ সময়ের মন্দার পর পুঁজিবাজারে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। ডিএসইএক্স সূচক ৬.৪৩ শতাংশ বেড়েছে এবং বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৪ ট্রিলিয়ন টাকায়। লেনদেনও বেড়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সংস্কার কার্যক্রমের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে।

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তিনটি- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার সফলভাবে বাস্তবায়ন। রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে আপাতত শক্ত ভিত দিলেও শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। শিল্প উৎপাদন বাড়ানো, রফতানি বহুমুখীকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, বন্ধ শিল্পকারখানা আবার চালু করা এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রবৃদ্ধির গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। তৃতীয় প্রান্তিকের এই অর্থনৈতিক চিত্র তাই এক দিকে সতর্কবার্তা, অন্য দিকে নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সুযোগও। সময়োপযোগী সংস্কার ও কার্যকর নীতিপদক্ষেপ নেয়া গেলে অর্থনীতি আবারো গতি ফিরে পেতে পারে। কিন্তু সংস্কার বিলম্বিত হলে প্রবৃদ্ধির এই নিম্নগতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।