নির্বাচনের আগেই গণমাধ্যমের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন উত্তাপ বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে গণমাধ্যমের ভূমিকা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনকালীন সময়ে গণমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে জনগণকে সঠিক, নির্ভুল ও ভারসাম্যপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করা- যাতে ভোটাররা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূলধারার সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিলিয়ে নির্বাচন-সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশন কতটা নিরপেক্ষ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষক, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীরা।

গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনকালীন সময়ে গণমাধ্যম কার্যত ‘জনগণের চোখ ও কান’ হিসেবে কাজ করে। এ সময়ে তথ্য বিকৃতি, অসম কভারেজ কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট উপস্থাপন সরাসরি ভোটারদের মতামতকে প্রভাবিত করতে পারে- যা গণতন্ত্রের জন্য গুরুতর ঝুঁকি।

৩ ধরনের প্রবণতা

খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান মিডিয়া পরিসরে তিনটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রথমত, একটি অংশ সরকারঘনিষ্ঠ অবস্থান থেকে সংবাদ পরিবেশন করছে- এমন অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আরেকটি অংশ বিরোধী রাজনীতিকে নেতিবাচক আঙ্গিকে উপস্থাপন করছে। তৃতীয়ত, নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করা কিছু প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপের কারণে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। ফলে নির্বাচনকালীন সংবাদমাধ্যমের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হক বলেন, ‘নির্বাচনের সময় গণমাধ্যমের দায়িত্ব অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ করাই গণমাধ্যমের নৈতিক কর্তব্য। পক্ষপাতমূলক কভারেজ ভোটারদের সিদ্ধান্তকে বিকৃত করে।’

একপক্ষীয় কভারেজের অভিযোগ

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করেছে- কিছু প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেল ও দৈনিক পত্রিকা নির্বাচন-সংক্রান্ত সংবাদে একপক্ষীয় আচরণ করছে। একটি দলের কর্মসূচি, উন্নয়নকার্যক্রম ও বক্তব্য গুরুত্বের সাথে প্রচার পেলেও অন্য দলগুলোর কর্মসূচি সীমিতভাবে বা নেতিবাচক শব্দচয়নে প্রকাশ পাচ্ছে। কোথাও কোথাও বক্তব্যই বাদ পড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবাদে শব্দচয়নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের কর্মসূচিকে কোথাও ‘সহিংসতা’ বা ‘নাশকতা’ বলা হচ্ছে, আবার অন্য ক্ষেত্রে ‘শান্তিপূর্ণ সমাবেশ’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ভাষার এই বৈষম্য পাঠক-দর্শকের মনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারণা তৈরি করে।

মালিকানা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাব

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘গণমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ নতুন কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা তখনই বাড়ে, যখন পেশাগত নৈতিকতার জায়গা দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মিডিয়া মালিকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ সংবাদ পরিবেশনে প্রভাব ফেলে।’

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বেশ কয়েকটি বড় মিডিয়া গ্রুপ সরাসরি করপোরেট বা রাজনৈতিক প্রভাবের সাথে যুক্ত। ফলে ‘সম্পাদকীয় স্বাধীনতা’ কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা সীমিত।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন সঙ্কট

নির্বাচন ঘিরে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবও দ্রুত বাড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক বক্তব্য ও ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে।

তবে এর সাথে বাড়ছে ভুয়া খবর, গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রবণতা। অনেক অনলাইন পোর্টাল ক্লিক বাড়ানোর লক্ষ্যে যাচাই ছাড়াই সংবাদ প্রকাশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডিজিটাল মিডিয়া বিশ্লেষক কায়সার রহমান বলেন, ‘ক্লিকবেইট শিরোনাম, অসম্পূর্ণ তথ্য ও প্রোপাগান্ডাভিত্তিক কনটেন্ট নির্বাচনকালীন সময়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে। এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

সাংবাদিকদের ওপর চাপ

নির্বাচনকালীন রিপোর্টিং করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর নানা ধরনের চাপও বাড়ছে। কখনো মালিকপক্ষের নির্দেশ, কখনো রাজনৈতিক দলের অসন্তোষ, আবার কখনো মামলা-হয়রানির আশঙ্কা স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাধা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একজন নেতা বলেন, ‘অনেক সাংবাদিক সত্য তুলে ধরতে চান, কিন্তু চাকরি হারানোর ভয়, আইনি ঝুঁকি ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে সেলফ-সেন্সরশিপে বাধ্য হন।’

মিডিয়া অধিকারকর্মীদের মতে, এই আত্মনিয়ন্ত্রণই সাংবাদিকতার বড় সঙ্কট- কারণ এতে জনগণ পূর্ণাঙ্গ সত্য জানতে পারে না।

নির্বাচন কমিশন, তথ্যপ্রবাহ ও আস্থার প্রশ্নে গণতন্ত্র

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের সাথে গণমাধ্যমের কার্যকর সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো ও স্বচ্ছ তথ্য না এলে গুজব ও বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়। সাবেক এক নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘নিয়মিত ব্রিফিং ও ডাটা শেয়ার করলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা সহজ হয়। একই সাথে গণমাধ্যমকেও অনির্ভরযোগ্য সূত্র এড়িয়ে তথ্য যাচাইয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, নির্বাচন শুধু ভোটের দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই পুরো প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম যদি জনগণের আস্থা হারায়, তাহলে গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘গণমাধ্যম যদি ক্ষমতার বাইরে থেকে সত্য তুলে ধরে এবং জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তাহলেই নির্বাচন অর্থবহ হয়। মিডিয়ার নিরপেক্ষতা মানেই গণতন্ত্রের শক্ত ভিত্তি।’

সামনে চ্যালেঞ্জ

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের গণমাধ্যম এখন এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব, তথ্য যাচাই, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা- এই পাঁচটি মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে না পারলে নির্বাচনকালীন গণমাধ্যমের ওপর জন-আস্থা আরো কমে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সমান কভারেজ নিশ্চিত করা, ফ্যাক্ট-চেকিং জোরদার করা, মালিকানা স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল গুজব প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা নেয়া, এসব পদক্ষেপই পারে গণমাধ্যমকে আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে।

শেষ পর্যন্ত, নির্বাচনকালীন গণমাধ্যমের ভূমিকা শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়, এটি গণতন্ত্র রক্ষারও দায়িত্ব।