ভাঙনের মুখে তীরভূমি
মেঘনা ধনু ঘোড়াউত্রায় বালু উত্তোলনের দৌরাত্ম্য
Printed Edition
আলি জামশেদ (বাজিতপুর) কিশোরগঞ্জ
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মেঘনা নদীসহ নিকলীর ধনু ও ঘোড়াউত্রা নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে ইজারার শর্ত ভেঙে দেদারসে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানায়, দিনের পাশাপাশি রাতেও অসংখ্য ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীতীর ভাঙন, কৃষিজমি ও বসতভিটা বিলীন হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী একটি চক্র প্রশাসনের নীরবতা বা দুর্বল তদারকির সুযোগ নিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জেও এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গত ৩০ জুন ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা মানববন্ধন করেন। তাদের অভিযোগ, ভৈরবের ইজারার সীমা অতিক্রম করে আশুগঞ্জ অংশ থেকে বালু উত্তোলনের কারণে নদীতীরের দোকানপাট ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রশাসনের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে দাবি তাদের।
অন্য দিকে নদীভাঙন ঠেকাতে ভৈরব শহর রক্ষায় বড় প্রকল্প নেয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার। গত ৬ জুলাই ভৈরবে জিও ব্যাগ ফেলার উদ্বোধনকালে পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শরীফুল আলম বলেন, জগন্নাথপুর থেকে মেন্দিপুর পর্যন্ত নদীতীর রক্ষায় একটি বড় বাঁধ নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রকল্প প্রণয়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও উপস্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, এক দিকে নদীভাঙন ঠেকাতে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হচ্ছে, অন্য দিকে একই এলাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু উত্তোলন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, তাহলে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে।
জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে ভৈরব শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে কয়েক দফায় সরকারি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। পরে দীর্ঘ সময় নদীর কাছাকাছি অংশে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও দুই বছর ধরে আবারো ব্যাপকহারে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, রাতের বেলায় প্রায় ৪০টি ড্রেজার নদী ও হাওরের বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলন করে। বহুবার অভিযোগ করেও ফল না পাওয়ায় তারা এখন নীরব হয়ে গেছেন। তাদের দাবি, প্রশাসন বলছে ‘সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বালু তোলার অনুমতি রয়েছে’। কিন্তু বাস্তবে রাতভর বালু উত্তোলন করা হলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
অভিজ্ঞদের মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের গঠন বিবেচনা না করে বালু উত্তোলন করলে নদীর গতিপথ বদলে যেতে পারে। এতে নদীতীরে ধস, কৃষিজমি নষ্ট হওয়া, মাছের প্রজনন ব্যাহত হওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যায়। নিকলী-বাজিতপুরসহ হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পুকুর ভরাট ও জমির শ্রেণী পরিবর্তনেরও নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অথচ প্রশাসনের এসব প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা চোখে পড়ে না। এর আগে ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর আশুগঞ্জের চর সোনারামপুর এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে চারটি ড্রেজার ও পাঁচটি বাল্কহেড জব্দ করে। ওই সময় একটি ড্রেজার ছিনিয়ে নেয়া, সরকারি কাজে বাধা এবং ইউএনওকে হুমকি দেয়ার অভিযোগে মামলা হয়, যা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ভৈরবের টুকচান্দপুর মৌজার ১ হার ৬১০ একর নদী এলাকায় ৯ কোটি ১৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬৫ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে। ১৪৩২ বঙ্গাব্দে ওই বালুমহাল ১৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় ইজারা দেয়া হয়। চলতি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে নতুন ইজারাদার দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদিত এলাকার বাইরে এবং নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে ইজারাদার অনেক বেশি বালু উত্তোলন করছে। তবে বর্তমান ইজারাদার শফিকুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা বৈধভাবেই বালু উত্তোলন করছেন।
আশুগঞ্জের ইউএনও রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেন, ভৈরবে ইজারার সীমা অতিক্রম করে নিষিদ্ধ এলাকায় বালু উত্তোলনের অভিযোগে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের অভিযানে সরকারি কাজে বাধা ও ড্রেজার ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় মামলাও করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো: নাহীদ হাসান খান বলেন, অনুমোদিত এলাকা ও নির্ধারিত পরিমাণের মধ্যেই বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। অতিরিক্ত উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, রাতে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমতি নেই।
তবে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, নদী রক্ষার প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত না হলে মেঘনা, ধনু ও ঘোড়াউত্রা নদীতীরের ক্ষয়ক্ষতি আরো ভয়াবহ রূপ নেবে।