রংপুর বিভাগে বাড়ছে জ্বালানি তেলের সঙ্কট : কর্মঘণ্টা নিয়ে বিপাকে মানুষ

Printed Edition
3rd-1
রংপুর বিভাগে বাড়ছে জ্বালানি তেলের সঙ্কট : কর্মঘণ্টা নিয়ে বিপাকে মানুষ

সরকার মাজহারুল মান্নান রংপুর ব্যুরো

  • সকাল ৬টা থেকে তেল দাবি
  • অর্ধেকেরও বেশি ফিলিং স্টেশন বন্ধ

দেড় মাসেও কাটেনি রংপুর বিভাগের জ্বালানি তেলে সঙ্কট। উল্টো বেড়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে সেটাও নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দেয়ায় জটিলতা আরো বেড়েছে। কর্মঘণ্টা অপচয় হচ্ছে।

বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী রংপুরে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ লিটার। সোয়া ৫ লাখ লিটার পেট্রলের চাহিদার বিপরীতে সোয়া দুই লাখ লিটার এবং দুই লাখ ৭৫ হাজার লিটার অকটেনের বিপরীতে ৮৫ হাজার লিটার সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রায় দেড় মাস ধরে চলছে। কোনো উন্নতি নেই। এ কারণে গ্রাহকদের ভোগান্তি এখন চরমে।

এমনিতেই জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। তার ওপর সরকার নির্ধারিত শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা এবং শুক্রবার দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত জ্বালানি তেল দেয়ার ঘটনায় ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা।

রংপুর শহরের শাপলা ইউনিক পাম্পে সকাল ৮টায় তেল নিতে আসেন বাবুল বর্মণ। তিনি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলায় গ্রামীণ ব্যাংকে চাকরি করেন। নিজের বাইকে তেল না থাকায় ৮ দিন বাইক চালাতে পারেনি। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বন্ধুর থেকে এক লিটার ধার নিয়ে রংপুরের বাড়িতে আসেন। যদি তেল না পান তাহলে অফিসে যাওয়া যাবে না। এর মধ্যে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তেল দেয়ার নিয়ম করা হয়েছে। তো আমি অফিস করব কখন, তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকব কখন। ভোর ৬টা থেকে বিকেল দেয়া হলে অন্তত অফিস করা যেত।’ এই পাম্পে কথা হয় বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক ওবায়েদ ইসলামের সাথে। তিনি জানান, তেল দেয়ার যে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, তা একেবারেই ঠিক হয়নি। কারণ দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পাম্পে দাঁড়িয়ে স্কুলে গিয়ে পড়াব কখন, সরকার কেন যে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করছে জানি না। অবশ্যই শুক্রবার ছাড়া অন্য দিনগুলোতে ভোর ৬টা থেকে তেল দেয়া উচিত।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আরডিআর এসে কাজ করেন রেজাউল করিম। তিনি জানান, কোনো দিনও একপাম্পে গিয়ে তেল পাওয়া যায় না। অন্তত ৫/৬টি পাম্প ঘুরতে হয়। আমি এনজিওতে চাকরি করি। সরকার যে সময় বেঁধে দিয়েছে সেই সময়মতো পেট্রল আনতে গিয়ে আমার অন্তত ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা যায়। একদিন যে পেট্রল পাই তা দিয়ে এক দিনের বেশি ফিল্ড করতে পারি না। আমার এরিয়া অনেক বড় যদি অন্য বাহনে যাই তাহলে বেতন ১০ দিনেই শেষ হয়ে যাবে। কী যে করি কিছুই বুঝতে পারছি না। অফিস থেকে প্রতিদিনই ঠেলা দেয়া হচ্ছে। নগরীর রহমান পাম্পে তেল নিতে এসেও লম্বা লাইন। একমিতে কাজ করেন আব্দুল লতিফ। তিনি জানান, বাইকের চাকা না ঘুরলে আমাদের চাকরি থাকে না। তেল নিতেই প্রতিদন ৪ ঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে। গ্রাহকের কাছে কখন যাই। টার্গেট কখন পূরণ করি। ভোরে তেল দেয়ার নিয়ম করা হলে ভালো হতো।

রহমান পাম্পের ম্যানেজার মাসুম জানান, ‘গত ছয় দিন আগে আমরা পেট্রল পেয়েছিলাম তিন হাজার লিটার। গত দু’দিন আগে পেট্রল পেয়েছি ১৫০০ লিটার। আমাদেরকে পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল দেয়া হচ্ছে না ডিপো থেকে। যতটুকু দিচ্ছে গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। বিশেষ করে মোটর সাইকেলের বেশি চাহিদা। চাঁদ পেট্রোলিয়ামের ম্যানেজার জানান, আমি দুই দিন পর পেট্রল পেয়েছিলাম তিন হাজার লিটার। এখন আমার মজুদ আছে ৩৯৬ লিটার। অকটেন আছে ৮১৯ লিটার । মেশিন নষ্ট হওয়ায় সেটাও দিতে পারছি না। গ্রাহকদের বোঝানো যাচ্ছে না। সরবরাহ পাচ্ছি না। সরবরাহ চ্যানেল দ্রুত ঠিক করা প্রয়োজন। প্রতিদিন তেল দেয়া উচিত ডিপো থেকে।

রংপুর বিভাগীয় পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির আগে প্রতিদিন ৩৫০টির বেশি পাম্প থেকে জেলা ও উপজেলাগুলোতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হতো। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির পর সরবরাহ সঙ্কটের কারণে অর্ধেকেরও বেশি পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি যেগুলোতে দেয়া হচ্ছে, সেটাতেও কয়েক দিন পরপর দেয়া হচ্ছে। সরবরাহ পরিস্থিতির চেইন দ্রুত উন্নতি না হলে পাম্প মালিকরা ভয়াবহ লোকসানের মুখে পড়বেন।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, ডিজেলের সরবরাহ ঠিক আছে। অকটেন পেট্রলের সরবরাহে কিছুটা ঘাটতিতে আছে। এটাও সমাধান হয়ে যাবে। তিনি সবাইকে সচেতন হয়ে জ্বালানি তেল ব্যবহার ও সংগ্রহের আহ্বান জানান।