লোডশেডিং নিয়ে প্যারাগ্রাফ মুখস্থ করতে হতো, এখনো হয়। পরীক্ষায় আসার হিটলিস্টে থাকত লোডশেডিং। কারণ এটি আমাদের নিয়মিত সঙ্কট। এ সঙ্কটের কোনো সমাধান নেই! সুতরাং পরীক্ষার খাতায় এটি সবসময় হিটলিস্টে থাকবে। লোডশেডিং নিয়ে রাজপথ গরম হবে। চ্যালেঞ্জে পড়বে সরকার। তারপর কোনোরকম ধামাচাপা দেয়া হবে। তারপরও ভয়াবহ লোডশেডিং...

এই ইনফিনিটি চক্র থেকে বের হওয়ার আশা নেই বলে ধরে নিয়েছি আমরা। অথচ চব্বিশের বিপ্লব হয়েছে চক্র ভেঙে দিতে। শেখ হাসিনার সময় ভারতের আদানি গ্রুপের সাথে অসম বিদ্যুৎ চুক্তি হয়েছে। আমরা বিদ্যুৎ নিই বা না নিই, ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে তাদের। সেই চার্জের বোঝা বইতে গিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কোমর ভেঙে যাওয়ার দশা!

এখন খাতা-কলমে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট; কিন্তু বাস্তবতা এর ধারেকাছেও নেই। সমস্যা নীতিনির্ধারণে অযোগ্যতা আর পরনির্ভরশীলতায়। এই দুই সমস্যায় লোডশেডিং এখন ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া আমাদের বিদ্যুৎব্যবস্থার বড় অংশ গড়ে তোলা হয়েছে গ্যাসভিত্তিক। মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে উনিশ-বিশ হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ অর্ধেকের নিচে নেমে যায়। এ প্রভাব গিয়ে পড়ে বিদ্যুতে। পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন দুই হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা আছে। সেই জায়গায় সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বন্ধ রাখা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লাভিত্তিক, সেগুলোর তাকিয়ে থাকতে হয় বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির দিকে। ওখানে সঙ্কট দেখা দিলে প্রভাব পড়ে বিদ্যুতে।

SUn

তৃতীয় সমস্যাটি হলো- সরকারের পকেটের টানাটানি অবস্থা! এর মধ্যে বকেয়া পড়ে আছে দেশীয় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদক ও বিদেশী জ্বালানি আমদানিকারকদের বিল। ডলার সঙ্কটে এই বকেয়া মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। জ্বালানি আমদানিতে খোলা যাচ্ছে না এলসি।

এই নানামুখী সঙ্কট বয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ। সেই সাথে যোগ হয়েছে ভুতুড়ে বিলের উৎপাত। এসব উৎপাত থেকে কি আমাদের রেহাই নেই?

এর মধ্যে একটি ইতিবাচক আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, ছয় মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের কার্যকর পরিকল্পনা যদি কোনো দল দিতে পারে, তাহলে সেটি শতভাগ বাস্তবায়ন করবে সরকার। রাজনীতিতে এমন চ্যালেঞ্জ সাধারণত দেয়া হয়। সাধারণত এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে এগিয়ে আসতে দেখা যায় না কাউকে; কিন্তু এবারের ঘটনা ভিন্ন- চ্যালেঞ্জ জানানোর পরপর সেটি ধরে বসলেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেছেন, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ইতোমধ্যে ৩০ দিন, ছয় থেকে ১৮ মাস এবং দীর্ঘমেয়াদের মোট ১৫ দফার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দিয়েছেন; কিন্তু সেই প্রস্তাব পড়ে দেখার সুযোগ হয়নি সরকারের নীতিনির্ধারকদের।

রাজনীতিতে শুরু হয়েছে ধাক্কাধাক্কি। এখন দেখা যাক, এ ধাক্কাধাক্কি কোথায় গিয়ে ঠেকে। সমাধানে কী পদক্ষেপ নেয় সরকার। সমাধানের কোনো না কোনো একটি পথ বেরিয়ে আসবে, এটি ঠিক। কিন্তু সেটি কি স্থায়ী সমাধান হবে? যদি স্থায়ী কোনো সমাধান না আসে, তাহলে তো সবসময় আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে মহেশখালীর দিকে। আমরা কেন প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে দেখছি না?

আমাদের আছে রোদ ঝলমল আকাশ। এমন ঝলমল রোদ পৃথিবীর অনেক দেশে নেই। বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকায় বাংলাদেশে বছরের বেশির ভাগ সময় খাড়াভাবে আলো দেয় সূর্য। এতে সরাসরি মাটি পর্যন্ত আলো পৌঁছে যায়। শীতপ্রধান দেশগুলোতে বছরের অনেকটা সময় তির্যকভাবে আলো নামে। ওই আলোতে এতটা শক্তি থাকে না। আবার সেসব দেশে শীতের সময় দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আলো থাকে, তাও টিমটিম করে জ্বলে। আমরা কিন্তু শীতেও পর্যাপ্ত রোদ পাই। ভোরের কুয়াশা কেটে যাওয়ার পর আলোর তেজ বেড়ে যায়। দেখা যায়, বছরে প্রায় ৩০০ দিন বা এর বেশি সময় নিরবচ্ছিন্ন আলো পাওয়া যায় বাংলাদেশে।

মরুর দেশগুলোতে রোদ প্রখর হয়; কিন্তু অতিরিক্ত প্রখরতায় সোলার প্যানেল বসাতে গেলে, তার কার্যক্ষমতা থাকে না। সে দিক থেকে আমাদের আবহাওয়া, আলোর প্রখরতা ও তাপের ভারসাম্য আছে। সে হিসেবে বলা যায়, চাইলে আমরা সৌরবিদ্যুতের বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারি। এটি কি আমাদের জন্য অলীক স্বপ্ন?

তাহলে চলুন ঘুরে আসা যাক আশপাশের কিছু উদাহরণ থেকে। ২০১৪ সালে ভারতে মোট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল মাত্র ২ দশমিক ৮২ গিগাওয়াট। ২০২৪ সালের শুরুতে সেটি বেড়ে হয়েছে ৬৬ গিগাওয়াট। ২০২৬ সালের মার্চে গিয়ে ভারতের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ১৫০ গিগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। শুধু এক বছরে দেশটির জাতীয় গ্রিডে নতুন করে যোগ হয়েছে ৪৪ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ।

ভারতের জাদুটা কোথায়? জাদু আছে তিনটি জায়গায়- উদ্যোগ, সাবসিডি ও সাহসিকতা। ২০২৪ সালে ভারত চালু করে ‘পিএম সূর্যঘর মুফত বিজলি যোজনা’। সাধারণ গৃহস্থ যদি ছাদে এক থেকে তিন কিলোওয়াটের সৌর প্যানেল বসান, তবে ভারত সরকার তাকে ৩০ হাজার থেকে ৭৮ হাজার রুপি পর্যন্ত সরাসরি নগদ প্রণোদনা বা অনুদান দেয়। আর কৃষকদের জন্য চালু করে ‘পিএম কুসুম’ প্রকল্প। এ প্রকল্পের অধীনে ডিজেলচালিত বা গ্রিডনির্ভর লাখ লাখ সেচপাম্পকে ৬০-৭০ শতাংশ সরকারি অনুদান ও সহজ ব্যাংকঋণে সৌরচালিত পাম্পে রূপান্তর করা হয়েছে। ফল? ভারতের লাখ লাখ কৃষক এখন বিনামূল্যে রোদের আলো ব্যবহার করে জমিতে পানি দিচ্ছেন, গ্রিডের ওপর থেকে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাপ এক ধাক্কায় নেমে গেছে।

চলুন এবার ভিয়েতনাম থেকে ঘুরে আসা যাক- ২০১৮ সালে ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ছিল প্রায় শূন্যের কাছাকাছি (মাত্র ৮৬ মেগাওয়াট)। কিন্তু করোনা মহামারীর বছর, অর্থাৎ- ২০২০ সালে ১২ মাসের ব্যবধানে ভিয়েতনাম জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে ১১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ! এক বছরে ১১ গিগাওয়াট! যার মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ ছিল বাসাবাড়ি ও কারখানার ছাদে বসানো ‘রুফটপ সোলার’। ২০২৫ সালের শেষে এসে ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা পৌঁছেছে ১৯ হাজার মেগাওয়াটে, যা দেশটির মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার ২৫ শতাংশের বেশি।

ভিয়েতনামের ছিল স্মার্ট ‘ফিড-ইন-ট্যারিফ’ নীতি। দেশটি ঘোষণা দিয়েছিল, আগামী এক বছরের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার বসিয়ে গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে পারবে, তাদের থেকে সরকার পরবর্তী ২০ বছর নির্দিষ্ট চড়া ও লাভজনক দামে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য থাকবে। ব্যস! বিনিয়োগকারীরা বুঝে গেলেন, দেরি করার অর্থ সুযোগ হারানো। ব্যাংকগুলো দেখল সরকার গ্যারান্টি দিচ্ছে, সুতরাং ঋণ দিতে ঝুঁকি নেই। দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ভিয়েতনামের ছাদগুলো সোলার প্যানেলে ঢেকে দিলেন।

পাকিস্তানের উদাহরণটা আরো চমকপ্রদ। পাকিস্তানে আইএমএফের শর্তে বিদ্যুতের দাম ১৫৫ শতাংশ বেড়ে গেল, সাধারণ মানুষের বেতনের এক-তৃতীয়াংশ চলে যেতে শুরু করল বিদ্যুৎ বিলের পেছনে। তখন পাকিস্তানি জনগণ সরকারের মুখের দিকে না তাকিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সোলার বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলল। সরকার সোলার সরঞ্জামে শুল্ক ছাড় দিলো। ‘নেট-মিটারিং’ ব্যবস্থা চালু করল। কৃষির অধিকাংশ সেচপাম্প সোলারে চলে যাওয়ায় পাকিস্তান গ্রিডের ওপর চাপ এক বছরে ৩৪ শতাংশ কমিয়ে এনেছে।

এখন প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশের পক্ষে কি এগুলো করা সম্ভব? আমাদের কি সেই ভৌগোলিক সুবিধা ও টেকনিক্যাল সম্ভাবনা আছে? উত্তর- এক শ’ বার আছে! আমাদের সম্ভাবনা উল্লিখিত দেশগুলোর চাইতে আরো বেশি। আমাদের ভুল ধারণা হলো- বড় সোলার পার্ক বানাতে গেলে হাজার হাজার একর আবাদি জমি নষ্ট হবে। বাংলাদেশ ছোট্ট একটি দেশ, এখানে জমি পাবো কোথায়? কিন্তু আন্তর্জাতিক গবেষণা কী বলছে? বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘নিও বিভি’ ঢাকা ও পাশের এলাকার ওপর একটি সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়েছে, ‘অ্যাসেসমেন্ট অব টেকনিক্যাল রুফটপ সোলার এনার্জি পটেনশিয়াল ফর ঢাকা অ্যান্ড গ্রেটার ঢাকা রিজিয়ন’। সেই গবেষণার ফল মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মতো!

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল ঢাকা সেন্টার এলাকাতে (ঢাকা শহর) চার লাখ ২৫ হাজার ২৪৪টি ভবন আছে। আর গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলে আছে আরো দুই লাখ ১৪ হাজার ২৪২টি ভবন। এর মধ্যে আবাসিক ভবন, বিশাল পোশাক কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও সরকারি অফিস আছে। এই নিও বিভির হিসাব অনুযায়ী, কেবল ঢাকা সেন্টারের ভবনগুলোর ছাদে রুফটপ সোলার প্যানেল বসালে ছয় হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট এবং বৃহত্তর ঢাকার আশপাশের ভবন থেকে তিন হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট, অর্থাৎ- মোট ১০ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব! যদি ধরে নিই সব ভবনের ছাদ উপযুক্ত নয়। অর্ধেকের বেশি ভবন পুরনো। তবু কেবল ঢাকা ও এর আশপাশের তিনটি জেলার ছাদ থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট ক্লিন, সবুজ সৌরবিদ্যুৎ তৈরি সম্ভব!

ভেবে দেখুন একবার! পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করতে কত বিলিয়ন ডলারের কয়লা বা এলএনজি আমদানি করতে হতো? কত হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হতো আদানিকে? অথচ এই পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেতে আমাদের এক ইঞ্চি জমিও অধিগ্রহণ করতে হচ্ছে না! জমি তৈরি আছে- আমাদের মাথার ওপর খালি পড়ে থাকা ঢাকার লাখ লাখ ছাদ!

কেবল ঢাকা কেন? পুরো বাংলাদেশের চিত্রটা ভাবুন। আমাদের গার্মেন্ট কারখানাগুলোর হাজার হাজার একর বিশাল বিস্তৃত শেডের ছাদ আছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা, সাইক্লোন শেল্টার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, জেলা পরিষদ ভবনের সুবিশাল ছাদও আছে। এর সাথে যদি যুক্ত করি যমুনা, পদ্মা ও মেঘনার চরাঞ্চলের অনাবাদি জমি, মহাসড়ক ও রেলপথের দুই পাশের খালি আইল, চা-বাগানগুলোর অব্যবহৃত উঁচু জমি এবং কাপ্তাই হ্রদ বা বিভিন্ন হাওরের জলে ‘ফ্লোটিং সোলার’ বা ভাসমান সৌর প্যানেল- তবে পুরো বাংলাদেশে ১০-১৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা কি অসম্ভব কিছু?

এত সম্ভাবনার পরও কেন আমরা লোডশেডিং মেনে নিচ্ছি? কারণ, সোলার প্যানেল কিনতে গেলে নানা জটিলতা পোহাতে হয়- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ঋণপত্রের অনিশ্চয়তা আর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পুরনো ধ্যানধারণা। বড় বড় জীবাশ্ম জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাতে অভ্যস্ত পিডিবি। এগুলোতে মেগা প্রজেক্টের মেগা বাজেট থাকে। সৌরবিদ্যুতের মতো বিকেন্দ্রীভূত কাজে সংস্থাটির আগ্রহী হওয়ার কথা নয়।হ

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

smmoshahid@gmail.com