একজন রাজনৈতিক নেতার প্রকৃত উত্তরাধিকার কী? পদ, ক্ষমতা, দল নাকি এমন কিছু রাজনৈতিক মূল্যবোধ, যা তার মৃত্যুর পরও সমাজকে প্রভাবিত করে? বেগম খালেদা জিয়া কী রেখে গেলেন বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে দরকার তার রাজনৈতিক জীবনের নির্মোহ মূল্যায়ন।
বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংসদীয় সরকারব্যবস্থা, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিরোধ- সব তার উত্তরাধিকারের অংশ। তবে এগুলোর মধ্যে একটি সুতা আছে। সেটি হলো নির্বাচনী রাজনীতির প্রতি আস্থা। ক্ষমতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধের সংস্কৃতি।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান স্বাভাবিক ছিল না। স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাজনীতির সামনে আসেন তিনি। কোনো রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ছিল না। ছিল না দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা; কিন্তু ছিল দৃঢ়তা। ছিল মানুষের সাথে যোগাযোগের ক্ষমতা। ছিল কঠিন সময়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সাহস। এভাবে বিএনপির নেত্রী থেকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্রে পরিণত হন তিনি। তার প্রথম বড় উত্তরাধিকার গণতান্ত্রিক রাজনীতির সাথে যুক্ত। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছিলেন অন্যতম প্রধান নেতা। আপসহীন নেত্রী।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান সামরিক শাসনের অবসান ঘটায়। এরপর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয় আসে। আরো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে পরে। দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে বাংলাদেশ। খালেদা জিয়া হন সংসদীয় ব্যবস্থার প্রথম প্রধানমন্ত্রী। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, সংসদীয় গণতন্ত্র একা খালেদা জিয়ার সৃষ্ট নয়; এটি ছিল গণ-আন্দোলন, রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা। ঐতিহাসিক পরিস্থিতির ফল। কিন্তু তিনি সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক চরিত্র ছিলেন। তার নেতৃত্ব ছাড়া সেই রূপান্তরের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। তাই তাকে সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রধান রাজনৈতিক স্থপতি বলা যায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নব্বইয়ের পরের সময়কে ‘তৃতীয় ঢেউয়ের’ গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখেন। তার পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকেও গণতান্ত্রিক হতে হবে। কথাটি খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার বিচারেও প্রযোজ্য। কারণ গণতন্ত্র শুধু সরকার পরিবর্তনের নাম নয়। গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা প্রতিষ্ঠান, দল, সংসদ, নির্বাচন ও রাজনৈতিক আচরণে।

খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় বড় উত্তরাধিকার বিএনপিকে একটি স্থায়ী জাতীয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি তার হাতে এসে নতুন রাজনৈতিক জীবন পায়। তিনি দলকে শুধু নির্বাচনী সংগঠন হিসেবে রাখেননি; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর সাংগঠনিক ভিত শক্ত করেছেন। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর বিস্তার ঘটেছে। একসময় ছাত্রদল দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ছাত্রসংগঠনগুলোর একটি ছিল। ফলে বিএনপি একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ নেয়ার সুযোগ পায়।
তৃতীয় উত্তরাধিকার জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। তিনি মনে করতেন, বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস, ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বাতন্ত্র্যকে ধারণ করে জাতীয় পরিচয় বিনির্মাণ হওয়া উচিত। এই রাজনৈতিক ধারা তিনি শুধু বক্তব্যে ধারণ করেননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এর প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারে কাজ করেছেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’কে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিণত করে। এ ধারার পক্ষে বারবার জনসমর্থন চেয়েছেন। নির্বাচনে গেছেন। রাজপথে লড়েছেন। প্রতিকূলতার মুখেও অবস্থান বদলাননি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সেই জাতীয়তাবাদী পরিচয়কে নির্বাচনী রাজনীতির একটি শক্তিশালী ভাষায় পরিণত করে। ফলে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ শুধু বিএনপির রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকেনি, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। তার অনুসারীদের কাছে এটি আজও রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
চতুর্থ উত্তরাধিকার তার ‘আপসহীন’ রাজনৈতিক চরিত্র। পরিচয়টি নিছক রাজনৈতিক প্রচারণা নয়। এর পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলন পর্যন্ত তিনি সঙ্ঘাত এড়িয়ে চলেননি। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সময় মামলা, কারাবাস, রাজনৈতিক চাপ, নিপীড়ন ও অসুস্থতার মধ্যেও তার রাজনৈতিক অবস্থান অনেক সময় অনড় ছিল। এখানে তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে প্রতিরোধের একটি চরিত্র হয়ে ওঠেন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক- ভোটের রাজনীতির প্রতি তার বিশ্বাস। বহুবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তার নেতৃত্বাধীন দল জিতেছে-হেরেছে। আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। তার কাছে জনগণের ভোট ছিল রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান ভিত্তি। ক্ষমতার উৎস জনগণ, এ ধারণা তার রাজনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রে ছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ নির্বাচন নিয়ে আস্থার সঙ্কট দীর্ঘদিনের। ভোটের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রের বৈধতা নিয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনায় বারবার ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার পর্যবেক্ষণের সারকথা, গণতন্ত্র বাংলাদেশের মানুষের কাছে কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি তাদের রাজনৈতিক অধিকার। তাই ভোটের অধিকার সঙ্কুচিত হলে গণতন্ত্রও সঙ্কুচিত হয়। খালেদা জিয়ার রাজনীতির এ দিক তরুণদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভোট মানে শুধু সরকার নির্বাচন নয়; ভোট মানে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারে এ বিশ্বাস একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। তার রাজনীতির এ উত্তরাধিকার আজও প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে।
এ প্রশ্নই তার উত্তরাধিকারকে আকর্ষণীয় করে। তার রাজনৈতিক প্রভাব ছিল অসাধারণ। তিনি বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক ধারার একটিকে কয়েক দশক ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সাথে তার দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো বদলে দিয়েছে। এই দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে, তেমনি মেরুকরণও বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারকে গণতন্ত্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সঙ্ঘাতের সাথে যুক্ত করা হয়েছে; কিন্তু এই প্রচারে লাভ হয়নি। প্রমাণ হয়েছে, খালেদা জিয়াই সঠিক ছিলেন। ফলও দেখা গেছে। শেখ হাসিনা পালিয়েছেন। খালেদা জিয়া সম্মান, মর্যাদা এবং মানুষের বিপুল ভালোবাসা-শ্রদ্ধায় অভিসিক্ত হয়ে চির বিদায় নিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ফিরে আসে তরুণদের কাছে। নতুন প্রজন্ম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে কী নেবে? শুধু দলীয় আনুগত্য? রাজনৈতিক উত্তরাধিকার? নাকি সাহস, ভোটের অধিকার, রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিকতা? জুলাইয়ের তরুণদের কাছে তার লড়াকু চরিত্রের যে আবেদন তৈরি হয়েছে, সেটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা স্লোগান নয়; তিনি রেখে গেছেন একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনা। জনগণের ভোটে ক্ষমতা পরিবর্তনের সম্ভাবনা। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা। একটি বড় রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা। সেই সাথে প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজনীতিতে টিকে থাকার সম্ভাবনা।
কিন্তু উত্তরাধিকার মানে শুধু অর্জন নয়। দায়ও। বিএনপির জন্য এ দায় অনেক বড়। খালেদা জিয়ার নামে রাজনীতি করা সহজ। তার রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়ন করা কঠিন। গণতন্ত্র চাইলে দলের ভেতরেও গণতন্ত্র চাই। ভোট চাইলে প্রতিপক্ষের ভোটের অধিকারও মানতে হবে। সংসদীয় ব্যবস্থা চাইলে সংসদকে কার্যকর করতে হবে। জবাবদিহি চাইলে নিজের দলকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আর একটি উত্তরাধিকারকে আলাদা করে দেখতে হয়। সেটি নারী নেতৃত্বের উত্তরাধিকার। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব নতুন নয়; কিন্তু খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থানের ধরন ছিল আলাদা। তিনি কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে শুরু করেননি। তবু তিনি পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রে উঠে এসেছিলেন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দীর্ঘ সময় প্রধান বিরোধী নেত্রীর ভূমিকা পালন করেছেন। অসংখ্য নারী তার মধ্যে নিজের শক্তির প্রতিচ্ছবি দেখেছেন। তার জনপ্রিয়তার দিকটি শুধু আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের চিহ্ন। একজন নারী যে কঠিন রাজনৈতিক সঙ্ঘাত মোকাবেলা করে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে থাকতে পারেন, খালেদা জিয়া তার একটি নজির। তার এই উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মের নারী রাজনীতিকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে তার জীবন দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে দলকে দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব হলেও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে উত্তরাধিকার সঙ্কটে পড়ে। তাই খালেদা জিয়াকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তার দৃঢ়তা স্মরণ করা নয়। তার অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ার শিক্ষাও নিতে হবে। কারণ ব্যক্তি চলে যান। প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। আর টেকসই গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির ওপর নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়ায়।
এই শিক্ষা আজ আরো জরুরি। বাংলাদেশের রাজনীতি বহুবার ব্যক্তিনির্ভর হয়েছে। ফলে নেতা বদলেছেন; কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায়নি। খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার যদি সত্যিই টিকে থাকে, তবে তা ব্যক্তিপূজায় নয়। টিকবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়ার মধ্য দিয়ে। এটিই হবে তার প্রতি বড় শ্রদ্ধা।
খালেদা জিয়ার প্রতি বড় শ্রদ্ধা প্রদর্শন হবে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কঠিন পরীক্ষাটি নেয়া। তিনি কী রেখে গেছেন, সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু ইতিহাস দেবে না; বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতিও দেবে। সেই উত্তর নির্ভর করবে দলটি তার নাম কতবার উচ্চারণ করল তার ওপর নয়; নির্ভর করবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা- জনগণের ভোট, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং প্রতিরোধের অধিকার কতটা বাস্তবে ধারণ করতে পারল তার ওপর।
খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন। তার রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়েছে; কিন্তু তার উত্তরাধিকার এখনো শেষ হয়নি। সেটি এখন বাংলাদেশের রাজনীতির হাতে।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন