মদিনার রাষ্ট্রব্যবস্থা আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মডেল হতে পারে
বায়তুশ শরফের সেমিনারে বক্তারা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা মদিনায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা সর্বাধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি অনুসরণীয় মডেল হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সা:-এর সুন্নাত অনুসরণ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মাদানী জীবনের ১০ বছর এবং খোলাফায়ে রাশেদার ৩০ বছরের রাষ্ট্র পরিচালনা ইসলামের রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
রাজধানীর ফার্মগেটের বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত ‘রাসূলুল্লাহ সা:-এর মাদানী জীবন : ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুসরণীয় রূপরেখা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ভিসি প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ আবদুল মালেক মোল্লা। বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র ঢাকার পরিচালক ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদীর সঞ্চালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: শহীদুল হক।
আলোচনায় অংশ নেন- আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ জাকির হোসেন, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. আবদুল লতীফ মাসুম, ড. রেজাউল করীম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল হোসাইন।
বক্তারা বলেন, ইসলামের রাষ্ট্রচিন্তা শুধু একটি তাত্ত্বিক বিষয় নয়; মহানবী সা: মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর সেখানে একটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর বাস্তব উদাহরণ সৃষ্টি করেন। মদিনায় প্রথম মসজিদকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ধর্ম, গোত্র ও সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন।
তারা বলেন, মদিনা সনদের মাধ্যমে মহানবী সা: মদিনার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে বহুজাতি ও বহু ধর্মের মানুষের সহাবস্থান এবং একটি সমন্বিত রাষ্ট্রকাঠামোর দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।
সেমিনারে মহানবী সা:-এর সামরিক নেতৃত্বের বিষয়টিও আলোচিত হয়। বক্তারা বলেন, তিনি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিজ হাতে পরিচালনা করেছেন এবং বিভিন্ন যুদ্ধে সর্বাধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা, যুদ্ধনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন। বক্তারা আরো বলেন, মহানবী সা:-এর রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ন্যায়বিচার ও সাম্য। সমাজের শক্তিশালী ও দুর্বল- সবার জন্য একই ধরনের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে মানুষের অধিকার সংরক্ষণ এবং সামাজিক বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল বলেও তারা উল্লেখ করেন। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, মদিনার রাষ্ট্রব্যবস্থায় জাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। জাকাতের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অধিকার নিশ্চিত এবং সম্পদের সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। তাদের মতে, একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম্পদের সুষম বণ্টন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেমিনারে শরিয়াহ-ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা ইসলামী বিশ্বাসের আলোকে বলেন, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মতোই ইসলামের আইন ও বিধান বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে শরিয়াহর বিধান কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তারা তুলে ধরেন। বক্তারা বলেন, মদিনার রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল শিক্ষা শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো নৈতিক ও আদর্শবান মানুষ তৈরি করা। তাই রাষ্ট্র সংস্কার বা নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আলোচনায় মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা ও আদর্শ চরিত্র গঠনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তাদের মতে, মহানবী সা: মদিনায় যে রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তার মূলনীতি- ন্যায়বিচার, পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ববোধ, সামাজিক সংহতি, ধর্মীয় সহাবস্থান ও জনকল্যাণ, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আলোচনাতেও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। এ কারণে মাদানী জীবনের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা সমকালীন রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজব্যবস্থার আলোচনায় নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সেমিনারে বক্তারা ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে আরো গবেষণা, অ্যাকাডেমিক আলোচনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। একইসাথে মদিনার রাষ্ট্রব্যবস্থার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দিকগুলো সমকালীন বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।