দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, অপরাধ বাড়ছে- সেই সাথে আদালতে বাড়ছে মামলা। মামলা নিষ্পত্তির জন্য পর্যাপ্ত বিচারক নেই। বিচার পেতে মানুষকে তাই বছরের বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির অবসান হওয়া দূরে থাক, আরো বাড়তে থাকবে।
সুপ্রিম কোর্টের বরাতে একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের জেলা আদালতে বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার। ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ছিল ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ১২১টি মামলা। দেড় যুগে মামলা বেড়েছে প্রায় ২৬ লাখ। তবে মামলার সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়লেও বিচারকের সংখ্যা মোটেও সেই তুলনায় বাড়েনি।
দেশের অধস্তন আদালতে বিচারক রয়েছেন দুই হাজার ২৩৭ জন। তার মধ্যে চার শতাধিক বিচারক সারা বছর নানা কারণে বিচারকাজ থেকে দূরে থাকেন। তাই বর্তমানে বিচারকাজ করছেন এক হাজার ৮৩৭ জন বিচারক। সে হিসাবে জনসংখ্যার তুলনায় দেশে গড়ে এক লাখের বেশি মানুষের জন্য বিচারক রয়েছেন মাত্র একজন!
তুলনামূলক চিত্রে আমরা দেখি, ডেনমার্কে ১৫ হাজারের বিপরীতে একজন, জাপানে ৫৭ হাজারের জন্য একজন, পাকিস্তানে ৫০ হাজারের জন্য একজন এবং ভারতে ৪৭ হাজারের বিপরীতে একজন বিচারক রয়েছেন।
অবশ্য পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ দিলেই যে নিম্ন আদালতে মামলাজট কমবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর সাথে আরো কিছু বিষয় জড়িত রয়েছে, যেগুলো নিয়ে কাজ করা দরকার।
২০২৩ সালে আইন কমিশন ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার জটের পাঁচটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে- পর্যাপ্ত বিচারক না থাকা, বিশেষায়িত আদালতে বিচারকের ঘাটতি, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, জনবল সঙ্কট এবং দুর্বল অবকাঠামো। সে সময় কমিশন আদালতে বিচারক সংখ্যা পাঁচ হাজারে উন্নীত করার সুপারিশ করে; কিন্তু বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়নি।
নিম্ন আদালতে বিচারক সঙ্কটের এই হাহাকার দ্রুত দূর করতে হবে। প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। আইনের মেধাবী শিক্ষার্থীরা যাতে বিচারক হতে আগ্রহী হন, সে জন্য বিাচরকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা বন্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। সেই সাথে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে (এডিআর) জোর দিতে হবে।
তৃতীয়ত, মামলাজট কমাতে বার ও বেঞ্চের ভূমিকা নিতে হবে। আইনজীবী ও বিচারকরা যদি দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি না চান, তাহলে কারো পক্ষেই দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়।
বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশ অনেক এগিয়েছে। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি-অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। এমন একটি সমাজে কেন দিন দিন অপরাধ ও মামলার সংখ্যা বাড়ছে, সে বিষয়ে বিশেষভাবে ভাবনার সময় এসেছে। সরকারকে অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের দিকে জোর দিতে হবে। অপরাধ বৃদ্ধির পথগুলো বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় মামলা বাড়বে, বাড়বে বিচারক; কিন্তু সমাজ থেকে অপরাধ দূর হবে না।