শাসক বদলালেও নদীর ভাগ্য বদলায়নি
Printed Edition
- হাত বদলে একই লুট
- দখলদার ২২ হাজার
- দখলের শীর্ষে কুমিল্লা
রাষ্ট্রের শাসক বদলালেও নদীর ভাগ্য বদলায়নি। সিন্ডিকেটের হাত বদল হলেও বন্ধ হয়নি দখল ও লুট। মাঠপর্যায়ে স্থায়ী তদারকি ও কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে পুরোদমে চলমান রয়েছে অবৈধ ড্রেজিং ও দখলদারিত্ব। ক্ষমতার পটপরিবর্তনে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীরা রাতারাতি বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। ঢাকার চারপাশের তুরাগ, বালু নদ থেকে শুরু করে নেত্রকোনার সোমেশ্বরী, সুনামগঞ্জের যাদুকাটা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস এবং দক্ষিণাঞ্চলের পদ্মা ও মেঘনা অববাহিকায় নতুন করে ড্রেজার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ফলে বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি, পরিবেশগত বিপর্যয় ও একাধিক দুর্যোগের ভয়ানক শঙ্কা বাড়ছে।
পরিবেশ বিষয়ক একাধিক সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, নদী দখল ও বালু উত্তোলনে বন্যার পানি নিষ্কাশনে দীর্ঘসূত্রতা, তীব্র নদীভাঙন ও বাঁধ ধস এবং নদীর ধারণক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প ও নতুন প্রভাবশালীদের সংযোগ খাল ও নদী ভরাট করার কারণে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক চ্যানেলগুলো সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। ফলে কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং দেশের অববাহিকা অঞ্চলগুলো থেকে বন্যার পানি সরতে দীর্ঘ সময় লাগছে।
অন্য দিকে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদীতে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার কারণে নদীর পাড় এবং বিলিয়ন টাকা ব্যয়ে নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও তীর রক্ষা বাঁধগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। বর্ষা বা পাহাড়ি ঢলের শুরুতেই বাঁধ ধসে নতুন করে বিস্তীর্ণ লোকালয় প্লাবিত হচ্ছে এবং হাজারো পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ছে।
এ ছাড়া যত্রতত্র গভীর ড্রেজিংয়ের কারণে নদীর তলদেশের ভূ-প্রকৃতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল বা অতিবৃষ্টির পানি ধারণ করতে না পেরে নদী উপচে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি নিমজ্জিত হচ্ছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)সহ পরিবেশবাদী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নদী ধ্বংসের ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এসব সংস্থার প্রতিবেদনে নদী দখল ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে দেশের সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের ভয়াবহতা উল্লেখ করা হয়।
সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে যে, নদী দখল ও বেপরোয়া বালু উত্তোলন যদি অবিলম্বে শূন্য-সহনশীল নীতি প্রয়োগ করে বন্ধ করা না যায়, তবে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।
জাতীয় সংসদে গতমাসে দেয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে নদ-নদীর অবৈধ দখলদারের সংখ্যা ২১ হাজার ৯৮৮ জন। সরকারি হিসাবে দেশে মোট নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৪১৫। তবে বিভিন্ন বেসরকারি ও গবেষণা সংস্থার পর্যবেক্ষণে দখলদারের সংখ্যা প্রায় ৪৯ হাজারের বেশি।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তৈরি করা দেশের নদী দখলদারদের জেলাভিত্তিক তালিকা অনুযায়ী, ৬৪ জেলার মধ্যে কুমিল্লা জেলায় সবচেয়ে বেশি নদী দখল ও দখলদার রয়েছে। একক নদী হিসেবে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতে সবচেয়ে বেশি অবৈধ স্থাপনা (প্রায় ৪ হাজার ৭০৭টি) চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী (২ হাজার ৪৯৩টি স্থাপনা)। এই দখলের ভূমিকায় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতি ও কৃত্রিম জলাবদ্ধতা পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্কের (বেন) যৌথ গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদী দখল ও সংযোগ খাল ভরাটের কারণে দেশের বন্যা পরিস্থিতি এখন মানবসৃষ্ট দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঢাকার চারপাশের তুরাগ, বালু নদ ও বুড়িগঙ্গাসহ দেশের প্রধান নদীগুলোর অববাহিকায় বড় বড় আবাসন প্রকল্প ও অবৈধ শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার কারণে নদীর বুক সরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে নদী ও সংযোগ খাল ভরাট করায় উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল বা অতিবৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হতে পারছে না। এর ফলে কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার পানি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকছে, যা স্থায়ী কৃত্রিম জলাবদ্ধতা ও মানবিক সঙ্কটের সৃষ্টি করছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএসের স্যাটেলাইট ইমেজ ও ভূ-প্রকৃতিবিষয়ক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বেপরোয়া বালু উত্তোলনের ভয়াবহ কারিগরি দিকগুলো উঠে এসেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন অমান্য করে নদীর পাড়ের কাছাকাছি এবং কালভার্ট-সেতুর নিচ থেকে গভীর ড্রেজারের মাধ্যমে বালু তোলায় নদীর তলদেশের মাটি আলগা হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ছিটমহল ও উপকূলীয় অঞ্চলে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও নদী তীর রক্ষা বাঁধগুলো বর্ষার শুরুতেই ধসে পড়ছে। যমুনা, পদ্মা ও মেঘনা অববাহিকায় অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
নদী রক্ষায় উচ্চ আদালতে একাধিক জনস্বার্থ মামলা পরিচালনাকারী মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন এইচআরপিবি এর পর্যবেক্ষণে প্রশাসনের জবাবদিহিতার অভাবকে দায়ী করা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের কঠোর প্রয়োগ নেই। স্থানীয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কিছু ড্রেজার জব্দ বা জরিমানা করলেও, রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপের মুখে উচ্ছেদ অভিযানগুলো টেকসই হচ্ছে না। রাতের আঁধারে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন ও নদী দখল প্রক্রিয়া অবিরত চলছে।
এবং দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবি তাদের বিভিন্ন গবেষণা ও স্থানীয় সুশাসনসংক্রান্ত প্রতিবেদনে নদী দখল ও বালু উত্তোলনকে ‘লুটের অর্থনীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আগের প্রভাবশালী চক্র আত্মগোপনে গেলেও শূন্যস্থানটি দখল করেছে নতুন ক্ষমতাসীন বা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী। ইজারা বহির্ভূত এলাকা থেকে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা এবং নদী দখলের পেছনে স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি অফিস ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের একাংশের পরোক্ষ আঁতাত বা দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। যার কারণে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে এবং নদীগুলো স্থায়ীভাবে ধ্বংস হচ্ছে।
এ বিষয়ে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার নয়া দিগন্তকে বলেন, বিরাজমান পরিসস্থিতি থেকে দেশের নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে কেবল রাজনৈতিক আশ^াস যথেষ্ট নয়। নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে বিবেচনা করে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। একই সাথে নদী দখল ও অবৈধ বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত নতুন-পুরনো সব অপরাধীর বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে প্রশাসনের ‘শূন্য-সহনশীল নীতি’ অবলম্বন করতে হবে। নয়তো অদূর ভবিষ্যতে দেশকে এক অপূরণীয় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে।