বাংলাদেশে গুম কেবল নির্দিষ্ট অপরাধ নয়; এটি একটি পরিবারের আজীবনের অনিশ্চয়তা, যন্ত্রণা এবং অন্তহীন অপেক্ষার নাম। একটি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে অন্তত লাশ খুঁজে পাওয়ার সুযোগ থাকে, কিন্তু গুম হওয়া মানুষের স্বজনরা বছরের পর বছর ধরে নিশ্চিত হতে পারেন না- তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন, নাকি হারিয়ে গেছেন চিরতরে। এই যে দুঃসহ অনিশ্চয়তা, এটিই গুমকে সবচেয়ে জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটিতে পরিণত করেছে।

সম্প্রতি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারে স্থায়ী আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার সংবাদ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। পূর্বে জারিকৃত অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ায় একটি স্বাধীন, স্বতন্ত্র, পরিপূর্ণ এবং স্থায়ী আইনি কাঠামো তৈরি করা সময়ের অনিবার্য দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই আইনি উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, আইনের প্রয়োগ এমন কঠোর হবে যাতে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় বা অরাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থাই এ ধরনের অপরাধ ঘটানোর সাহস না পায়।

বাংলাদেশে গুমের প্রসঙ্গ এলেই বহু নিখোঁজ মানুষের নাম সামনে আসে। কেউ কেউ অলৌকিকভাবে ফিরে এসেছেন, অনেকের তেমন সৌভাগ্য হয়নি। যেমন, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে লে. জেনারেল (অব:) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ থেকে জীবিত ফিরে এসে নিজের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। কিন্তু যারা আজো ফেরেননি, তাদের স্বজনদের আকুল আকুতি, ‘তারা কোথায়?’ তারা কি জীবিত আছেন, নাকি তাদের হত্যা করা হয়েছে? এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দেয়ার প্রধান দায় রাষ্ট্রের।

একটি কার্যকর গুমবিরোধী আইন কেবল অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করে থেমে থাকতে পারে না। নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান লাভ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জবাবদিহি নিশ্চিত করাও এই আইনের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত তাই খসড়া পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, খসড়া আইনে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া দরকার। পাশাপাশি তদন্তকারী ও প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষাও জরুরি। সংসদে আইন পাসের আগে এসব বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা আবশ্যক।

আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তদন্তপ্রক্রিয়া নিরপেক্ষ, দ্রুত ও দৃশ্যমান করা। যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে তদন্ত ও বিচার নিষ্পত্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তা কার্যকর করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অতীতে আমরা বহু স্পর্শকাতর ঘটনার তদন্ত বছরের পর বছর ফাইলবন্দী থাকতে দেখেছি। ফলে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, এর বাস্তব প্রয়োগই হবে রাষ্ট্রের সদিচ্ছার চূড়ান্ত পরীক্ষা।

মনে রাখতে হবে, গুম কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক ইস্যু নয়। ক্ষমতায় যে-ই থাকুক না কেন, গুম সর্বজনীন মানবাধিকার ও আইনের শাসনের চরম পরিপন্থী। ফলে এই আইনটি এমন হতে হবে, যা যেকোনো সরকারের আমলেই সমভাবে প্রযোজ্য হবে এবং কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না।

এখনো বহু পরিবার প্রিয়জনের ফেরার পথ চেয়ে প্রহর গুনছে। অনেকেরই ধারণা, দেশে হয়তো আরো গোপন আটককেন্দ্র বা ‘আয়নাঘর’ রয়ে গেছে। এসব দাবির সত্যাসত্য নিরূপণে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান চালানো রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। পাশাপাশি অতীতের প্রতিটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হতে হবে, যাতে সত্য উন্মোচিত হয় এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের পরিণতি জানতে পারে।

গুমবিরোধী আইনের খসড়া চূড়ান্ত হওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে যেকোনো আইনের প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করে এর প্রয়োগ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশের এমন একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও শক্তিশালী আইন প্রয়োজন, যা গুমের পুনরাবৃত্তি চিরতরে বন্ধ করবে এবং অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করবে। গণতান্ত্রিক ও আইনি শাসনভিত্তিক সমাজে গুমের কোনো স্থান থাকতে পারে না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক