নিরস্ত্র হওয়ার শর্ত হামাসের প্রত্যাখ্যান
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সামরিক শাখা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের নিরস্ত্র হওয়ার দাবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের দাবি, গাজায় ইসরাইলি ‘গণহত্যা’ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যেই এই প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে। রোববার এক টেলিভিশন ভাষণে হামাসের মুখপাত্র বলেন, গাজা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ ইসরাইল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার আগে অস্ত্র ত্যাগের বিষয়ে আলোচনা করা হবে না। তিনি এই দাবিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে যাওয়ার একটি প্রকাশ্য প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেন। গাজায় যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে হামাসকে নিরস্ত্র করার বিষয়টি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৭০৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা। মুখপাত্র বলেন, শত্রুরা আজ আমাদের মধ্যস্থতাকারী ভাইদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ওপর যা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমরা কোনো অবস্থাতেই এটি মেনে নেব না। তিনি মধ্যস্থতাকারীদের আহ্বান জানান যাতে ইসরাইল চুক্তির প্রথম ধাপের প্রতিশ্রুতিগুলো আগে পূরণ করে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং অন্তত এক লাখ ৭২ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।
গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত
গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে সোমবার এক ফিলিস্তিনি নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। আনাদোলু এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, খান ইউনুসের উত্তর-পূর্বে আল-কারারা এলাকার কাছে বেসামরিক যানবাহনের ওপর গুলি চালালে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইসরাইলি সেনারা নির্ধারিত নিয়ন্ত্রণসীমার বাইরে অবস্থান নিয়ে এই হামলা চালায়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকেই এখন পর্যন্ত ৭২৩ জন নিহত ও এক হাজার ৯৯০ জন আহত হয়েছেন। উল্লেখ্য, দুই বছরের যুদ্ধে গাজায় ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।
গাজায় শিশুমৃত্যু-মানবিক বিপর্যয় নিয়ে উদ্বেগ, চিকিৎসা ও শিক্ষায় গভীর সঙ্কট
গাজা উপত্যকায় চলমান সঙ্ঘাতে শিশুদের ওপর প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ফিলিস্তিনি সংস্থা। ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরোর (পিসিবিএস) এক খবরে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত দুই বছরে ২১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে এবং ৪৪ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
এই সময়ে মোট নিহতদের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। নিহত শিশুদের মধ্যে শত শত নবজাতক ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুও রয়েছে। শুধু হামলায় নয়, অবরোধ, অপুষ্টি ও ঠাণ্ডাজনিত কারণেও শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে অন্তত ১৫৭ শিশু অনাহারে এবং কয়েকজন বাস্তুচ্যুত শিশু শীতের কারণে মারা গেছে। ফলে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ফিলিস্তিনি শিশুদের জীবনযাত্রায় তেমন কোনো স্বস্তি ফেরেনি। চলতি বছরের ফিলিস্তিনি শিশু দিবসও তারা উদযাপন করেছে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার ছায়ায়। পুনর্গঠনের উদ্যোগ না থাকায় হাজারো শিশু এখনো তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। নয় বছর বয়সী আভদে তাদেরই একজন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি হামলার কারণে নিজ শহর বেইত হানুন ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় সে। এক হামলায় তার বাবা ও চাচা নিহত হন, পরিবারের অন্য সদস্যরা আহত হন। বর্তমানে গাজার নাসর এলাকায় একটি আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছে আভদে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে জানায়, ‘আমি শুধু চাই যুদ্ধ শেষ হোক, আমি যেন আবার আমার ঘর ও স্কুলে ফিরতে পারি।’ গাজায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে থাকায় আহত শিশুদের চিকিৎসাও ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় চার হাজার শিশু জরুরি চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১০ হাজার শিশু স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছে এবং অনেকেই অঙ্গহানি ভোগ করেছে। এদিকে মানবিক সঙ্কট আরো গভীর হয়েছে অপুষ্টি ও বাস্তুচ্যুতির কারণে। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন হাজার ৭০০-এর বেশি শিশু অপুষ্টিজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অধিকাংশ শিশু পর্যাপ্ত খাদ্য পাচ্ছে না এবং ৯০ শতাংশের বেশি শিশু সুষম খাদ্য থেকে বঞ্চিত। এ ছাড়াও প্রায় ২০ হাজার মানুষ, যার মধ্যে অন্তত পাঁচ হাজার শিশু, চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়ার অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু রাফাহ সীমান্ত বারবার বন্ধ থাকায় খুব অল্পসংখ্যক রোগী বাইরে যেতে পারছে। ফলে গুরুতর অসুস্থ শিশুরা জীবনঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ওষুধ ও পুষ্টির ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। একই সাথে অপুষ্টি ও চিকিৎসার অভাবে নবজাতক ও অপরিণত শিশুদের ঝুঁকি বাড়ছে। কখনো কখনো এক ইনকিউবেটরে একাধিক শিশুকে রাখতে হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলায় শত শত স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী শিক্ষার সুযোগ হারিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকরা ‘তাঁবু স্কুল’ চালু করেছেন, যেখানে প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থী অত্যন্ত সীমিত সম্পদ নিয়ে পড়াশোনা করছে।
পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা : ঘরবাড়ি-যানবাহনে অগ্নিসংযোগ
অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুসের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১০ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। সোমবার ভোরে লুব্বান ও কুসরা এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। লুব্বান গ্রামের স্থানীয় কাউন্সিল প্রধান ইয়াকুব ওউইস আনাদোলুকে জানান, বসতি স্থাপনকারীরা একটি বেদুইন সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালিয়ে বাসিন্দাদের মারধর করে। এতে ১০ জন আহত হন, যাদের মধ্যে দু’জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। হামলার সময় ঘরবাড়ি ও যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। প্রায় ১০টি গাড়ি পুড়ে যায় এবং দু’টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার একটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্যদিকে, পাশের কুসরা শহরেও একই ধরনের হামলা চালানো হয়। সেখানে একটি ফিলিস্তিনি গাড়িতে আগুন দেয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে হামলাকারীদের সংঘর্ষ বাধে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েক ডজন তরুণ প্রতিরোধ গড়ে তুললে বসতি স্থাপনকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফিলিস্তিনি তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে এক হাজার ১৪০ জনের বেশি মানুষ নিহত, প্রায় এগার হাজার ৭৫০ জন আহত এবং প্রায় ২২ হাজার জন গ্রেফতার হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলা শুধু তাৎক্ষণিক সহিংসতা নয়, বরং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি ও তাদের বাস্তুচ্যুত করার বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ।
ইসরাইলের নীতিই ‘ফিলিস্তিনি সঙ্কটের মূল কেন্দ্রে’
ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসঙ্ঘের সহায়তা সংস্থা ইউএনআরডব্লিইএ-কে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির ওপর ইসরাইলের ধারাবাহিক চাপ ও হামলাকে অনেক বিশ্লেষক ফিলিস্তিন সঙ্কটের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তুলে ধরছেন। আলজাজিরার মতামত কলামে বলা হয়, ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের সহায়তার জন্য গঠিত ইউএনআরডব্লিইএ দীর্ঘ দিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, খাদ্য সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শরণার্থী শিবির উন্নয়নে কাজ করে আসছে। গাজা ও পশ্চিম তীরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সংস্থাটির কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে ইসরাইল বহু বছর ধরেই ইউএনআরডব্লিইএ-র কার্যক্রমের সমালোচনা করে আসছে এবং সংস্থাটিকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হলে এই চাপ আরো বেড়ে যায়। ইসরাইল ইউএনআরডব্লিইএ-র কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে হামাসের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলে, যদিও পরবর্তীতে একটি স্বাধীন তদন্তে এসব অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই অভিযোগের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি বড় দাতা দেশ সাময়িকভাবে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়, ফলে সংস্থাটির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ইউএনআরডব্লিইএ কর্তৃপক্ষ জানায়, অর্থসঙ্কটের কারণে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়ে। এদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় সঙ্ঘাত চলাকালে ইউএনআরডব্লিইএ-র শতাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং শত শত কর্মী নিহত হয়েছেন। এতে সংস্থাটির সক্ষমতা আরো দুর্বল হয়ে পড়ে। বিদায়ী কমিশনার জেনারেল ফিলিপ লাজারিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইউএনআরডব্লিইএ ‘ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে’ পৌঁছে গেছে। তিনি সংস্থাটিকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক ও রাজনৈতিক সহায়তা বাড়াতে দাতা দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইউএনআরডব্লিইএ শুধু একটি মানবিক সংস্থা নয়, বরং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকার ও পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও কাজ করে। ফলে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্কটকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।