কালিহাতীতে ত্রিমুখী লড়াইয়ের উত্তাপ

বিএনপি-জামায়াতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ লতিফ সিদ্দিকী

Printed Edition
bangla-1
বিএনপি-জামায়াতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ লতিফ সিদ্দিকী

মালেক আদনান টাঙ্গাইল

টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) সংসদীয় আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। এলাকাজুড়ে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। গণসংযোগ, মিছিল, সভা-সমাবেশে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠছে গ্রাম-গঞ্জ, হাটবাজার ও সড়কপথ। এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল।

টাঙ্গাইলের এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে এবার হাফ ডজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। তবে ভোটের মূল লড়াই গড়ে উঠেছে তিন প্রার্থীর মধ্যেই।

এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হাঁস প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। তার বিরুদ্ধে লড়বেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও শিল্পপতি লুৎফর রহমান মতিন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এবং জেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে। স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন প্রার্থীর মধ্যেই ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার লিয়াকত আলী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আলী আমজাদ হোসেন এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হালিম মিঞা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও তাদের নিয়ে ভোটারদের মধ্যে তেমন আলোচনা কিংবা সমালোচনা দেখা যাচ্ছে না।

কালিহাতী আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই ‘মন্ত্রীর আসন’ হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক প্রয়াত শাজাহান সিরাজ এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে একাধিকবার মন্ত্রিত্ব করেন। একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী ছিলেন আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীও। তবে ২০১৪ সালে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা:) ও পবিত্র হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে দেশব্যাপী আন্দোলনের মুখে পড়েন তিনি এবং আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। সেই সাথে মন্ত্রিত্বও হারান এই হ্যাভিওয়েট প্রার্থী। দীর্ঘ সময় রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার পর ধীরে ধীরে আবার তিনি সক্রিয় হয়ে উঠেন।

২০১৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিলেও নৌকার কর্মীদের হামলার মুখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। সে নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগের হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারী। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি আবারো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নৌকার প্রার্থী মোজহারুল ইসলাম তালুকদারকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের জন্য তিনিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি মানুষের মৌলিক অধিকার ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করি। আমার জয় মানে জনগণের জয়।’

নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ প্রার্থী দেয়নি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী নিজ দলীয় প্রার্থী না দিয়ে বড় ভাই আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে সমর্থন দিয়েছেন, যা নির্বাচনী সমীকরণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়নকে কেন্দ্র করে কালিহাতীতে দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে আসে। একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা লুৎফর রহমান মতিন ও বেনজীর আহমেদ টিটু। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ তুলে দেয়া হয় মতিনের হাতেই। এতে দলের ভেতরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কোন্দল বিএনপির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক নির্বাচনী ডামাডোল শুরুর আগেই মাঠে সক্রিয় ছিলেন। বর্তমানে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে তিনি ধারাবাহিক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। জোটের শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীরাও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে রয়েছেন। এটি তার প্রথম সংসদ নির্বাচন হলেও সংগঠিত প্রচারণায় তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসী। অধ্যাপক খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা সামাজিকভাবে জনগণের সাথে সম্পৃক্ত। যেখানে যাচ্ছি, ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।’

বিএনপির প্রার্থী লুৎফর রহমান মতিনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে কালিহাতী উপজেলা বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম শোভা বলেন, ‘মনোনয়ন নিয়ে কিছু অসন্তোষ থাকলেও নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছেন। বিএনপির ভোট অন্য কোথাও যাবে না।’

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, কালিহাতী আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৭৪ হাজার ৯১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৮৯ হাজার ৯৪২ জন, নারী ভোটার এক লাখ ৮৪ হাজার ৯৭২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার তিনজন। গত নির্বাচনের তুলনায় ভোটার বেড়েছে ২০ হাজার ৩৬১ জন। মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১১৪টি।

সব মিলিয়ে কালিহাতী আসনে ত্রিমুখী এই লড়াইয়ে অনেকেই বলছেন, নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হবে তরুণদের ভোট কোন দিকে যায়, তার ওপর।