জুলাই বিপ্লবের নেপথ্য কারিগর আমলা বঞ্চিত কেন?

শামসুল আলমের নিয়োগ ঘিরে অন্তর্বর্তী সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রবল অভিঘাতে দীর্ঘ দিনের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটলেও প্রশাসনের ভেতরে পুরনো কাঠামো ও মানসিকতার বড় একটি অংশ এখনো বহাল রয়েছে-এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষপর্যায়ে এসে একটি নির্দিষ্ট নামকে ঘিরে সেই অভিযোগ আরো জোরালোভাবে সামনে এসেছে। তিনি হলেন মো: শামসুল আলম, নবম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যাকে জুলাই আন্দোলনের সংগঠকরা গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেপথ্য কারিগর হিসেবে বিবেচনা করছেন।

এই প্রেক্ষাপটে গত বুধবার সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহসানুল হকের সাথে জুলাইযোদ্ধা ও ছাত্র প্রতিনিধিদের স্মারকলিপি প্রদান ও বৈঠকে বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসে। বৈঠকে মো: শামসুল আলমকে তার জ্যেষ্ঠতা, পেশাগত দক্ষতা ও জুলাই আন্দোলনে ভূমিকার আলোকে সিনিয়র সচিব পদে পদায়নের দাবি জানানো হয়।

প্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, জনপ্রশাসন সচিব তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বিষয়টি যৌক্তিক বলে স্বীকার করেন। তিনি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনা করে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন-‘ওয়ারিয়র্স অব জুলাই’-এর সভাপতি সালমান হোসেন, ছাত্র প্রতিনিধি হাসিবুল হাসান জিসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী সিনথিয়া সেহরিন, বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি কাজী আশরাফুর রহমানসহ আরো অনেকে।

‘৩৬ জুলাই’-এর ধারণা যেখান থেকে : জুলাই আন্দোলনের সময় ‘৩৬ জুলাই’ শব্দবন্ধটি একটি প্রতীকী রাজনৈতিক ভাষায় রূপ নেয়। আন্দোলনকারীদের মতে, এই ধারণার অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন মো: শামসুল আলম। আন্দোলনের সমন্বয়কদের সাথে ২০২৪ সালের ২ আগস্ট রাতে এক তীব্র মতবিরোধপূর্ণ বৈঠকে তিনি ৯ দফার পরিবর্তে এক দফায়-শেখ হাসিনার পতনের দাবিতে আন্দোলন কেন্দ্রীভূত করার পক্ষে অবস্থান নেন।

সেই সময় তার উচ্চারিত বক্তব্য- ‘হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত জুলাই শেষ হবে না’-দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের অন্যতম ঐক্যবদ্ধ স্লোগানে পরিণত হয়।

আন্দোলনের একাধিক সংগঠকের দাবি, প্রবাসে নির্বাসিত অবস্থায় থেকেও তিনি নিয়মিতভাবে আন্দোলনকারীদের কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিতেন। কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কখন, কিভাবে আন্দোলনের ধাপ এগোবে সে বিষয়ে তিনি পর্দার আড়াল থেকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে গেছেন।

একজন আন্দোলন সমন্বয়ক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমরা শামসুল আলমের মূল্যায়নের অপেক্ষায় থাকতাম। অথচ মাসের পর মাস, বছর পেরিয়ে গেলেও তাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। যাদের আন্দোলনে কোনো ভূমিকা ছিল না, এমন অনেক আমলাকে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে।’

দক্ষ কর্মকর্তা হলেও দীর্ঘ বঞ্চনার অভিযোগ : মো: শামসুল আলম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন সিনিয়র ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে (২০০৯-২০২৪) তিনি রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘ সময় পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে চাকরিতে পুনর্বহাল করেন এবং মন্ত্রিপরিষদ বা মুখ্য সচিব পর্যায়ের দায়িত্বে পদায়নের নীতিগত অনুমোদন দেন বলে জানা যায়। তবে আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের পথে কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা বাধা সৃষ্টি করেন।

তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি না করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করা হয়। এমনকি সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতি সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির অনুমোদিত সারসংক্ষেপ এখনো কার্যকর হয়নি।

প্রশাসন বিশ্লেষকদের মত : এ বিষয়ে সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশ্লেষক ড. আব্দুস সবুর বলেন, ‘যদি একজন কর্মকর্তা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়ে বরং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তাহলে তাকে বঞ্চিত রাখা প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এতে সংস্কারের বার্তা দুর্বল হয়ে পড়ে।’

তিনি আরো বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করছে এ ধরনের প্রতীকী ও নৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। ‘জুলাই আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত করা না যায়, তাহলে জনগণের হতাশা বাড়বে।’

আন্দোলনের হুঁশিয়ারি : জুলাইযোদ্ধাদের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বারবার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মো: শামসুল আলমকে উপযুক্ত পদে নিয়োগ না দেয়া হলে তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হবেন।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে-জুলাই বিপ্লবের পর প্রশাসনের ভেতরে সত্যিকার অর্থে কতটা পরিবর্তন এসেছে? নাকি পুরনো কাঠামো ও নেটওয়ার্ক এখনো নতুন সময়ের পথ রুদ্ধ করে রাখছে?

শামসুল আলমের পদায়নের প্রশ্নটি এখন আর কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিষয় নয়; বরং এটি অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার সদিচ্ছা ও নৈতিক অবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্দোলন সংশ্লিষ্টরা।