ট্রান্সকম গ্রুপের সিমিনসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ

Printed Edition

আদালত প্রতিবেদক

ভুয়া স্বাক্ষর ও জাল স্ট্যাম্প ব্যবহার করে ট্রান্সকম গ্রুপের ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির সিইও সিমিন রহমানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। গতকাল ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো: সেফাতুল্লাহ মামলার অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে এ পরোয়ানা জারি করেন। সিমিন রহমান ছাড়াও যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, তারা হলেন- ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা লতিফুর রহমানের স্ত্রী শাহনাজ রহমান এবং গ্রুপটির পরিচালক সামসুজ্জামান পাটোয়ারী। প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) মোক্তার হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা ছয় আসামির মধ্যে ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক মো: কামরুল হাসান, মো: মোসাদ্দেক ও আবু ইউসুফ মো: সিদ্দিক আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাদের পক্ষে আইনজীবী মনির হোসেন স্থায়ী জামিনের আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। তবে সিমিন রহমানসহ অপর তিন আসামি আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শাযরেহ হক গুলশান থানায় মামলাটি দায়ের করেন। তদন্ত শেষে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে সিমিন রহমানসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ২০২০ সালের ১৬ জুন ঢাকায় ট্রান্সকম গ্রুপের একটি বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয় বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়। সভার এজেন্ডায় ছিল- পূর্ববর্তী সভার সিদ্ধান্ত অনুমোদন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় অংশগ্রহণ ও ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের অনুমোদন এবং লতিফুর রহমানের শেয়ার হস্তান্তর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। তবে সভার হাজিরা শিটে লতিফুর রহমানকে ছুটিতে দেখানো হলেও তার স্বাক্ষর সংযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া হাজিরা শিটে আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর থাকলেও ওই সময় তিনি কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন বলে তদন্তে জানা যায়।

ওই তথাকথিত বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লতিফুর রহমানের মালিকানাধীন ২৩ হাজার ৬০০টি শেয়ারের মধ্যে বড় মেয়ে সিমিন রহমানকে ১৪ হাজার ১৬০টি এবং ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও ছোট মেয়ে শাযরেহ হককে চার হাজার ৭২০টি করে শেয়ার হস্তান্তরের অনুমোদন দেয়া হয়।

বাদিপক্ষের দাবি, ১৩ জুন এমন কোনো বোর্ড সভাই অনুষ্ঠিত হয়নি। তদন্তকালে বোর্ড সভা ও সংশ্লিষ্ট রেগুলেশনের কাগজপত্র উপস্থাপনের জন্য বলা হলেও আসামিপক্ষ থেকে কোনো নথি সরবরাহ করা হয়নি। একই সাথে সভা আয়োজনের আগে কোনো ই-মেইল, ডাকযোগে নোটিশ বা চিঠির কপিও পাওয়া যায়নি। অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, ২০২০ সালের ১৩ জুন ট্রান্সকম লিমিটেডের শেয়ার হস্তান্তরের কাগজপত্র আরজেএসসিতে জমা দেয়া হয়। যদিও ১৭ জুন শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়, আরজেএসসি বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত ফি পরিশোধ না করে প্রায় আড়াই মাস পর, ২ সেপ্টেম্বর সেই ফি দেয়া হয়- যা নিয়মবহির্ভূত।

শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা কোনো পক্ষই আরজেএসসিতে উপস্থিত ছিলেন না। কেবল আসামিদের পক্ষে আইনজীবী অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। অথচ বিধি অনুযায়ী, শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা উভয়পক্ষকে সশরীরে উপস্থিত থেকে আরজেএসসির প্রতিনিধির সামনে স্বাক্ষর করার কথা। তদন্তে আরো উঠে আসে, ২০২০ সালে ভাই-বোনদের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে সিমিন রহমান পারিবারিক ডিড অব সেটেলমেন্ট ও সিমিন গ্রুপ অব কোম্পানির বিভিন্ন নথি তৈরি করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি দু’টি জাল নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প এফিডেভিট ব্যবহার করে সেখানে বাবা, ভাই, ছোট বোন শাযরেহ হকসহ অন্যদের স্ক্যান করা স্বাক্ষর সংযুক্ত করেন এবং পরে সেগুলো আরজেএসসিতে দাখিল করেন।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে দাখিল করা ডাক বিভাগ ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শাযরেহ হকের নামে ব্যবহৃত নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পটি ২০২৩ সালে তৈরি, যা ২০২০ সালের ঘটনায় ব্যবহারের দাবি সম্পূর্ণ অসত্য।

চার্জশিটে আরো বলা হয়, সংশ্লিষ্ট স্ট্যাম্প ভেন্ডরের লাইসেন্স ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাতিল করা হয়। তবুও তিনি অসদুপায়ে ২০২৩ সালে স্ট্যাম্প সংগ্রহ করে তা ২০২০ সালের ৩ মার্চের তারিখ উল্লেখ করে নিজ স্বাক্ষরে সরবরাহ করেন।