বেড়েছে মশা, অতিষ্ঠ নগরবাসী মশক নিধন কর্মসূচিতে ঢিলেমি

Printed Edition
Nagar-1
দেখার কেউ নেই : রাজধানীর ১ নং জাতীয় স্টেডিয়াম চত্বরে ময়লার ভাগাড়। এতে পরিবেশ দূষণসহ বাড়ছে মশার উপদ্রব : মো: শরীফ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বেড়েছে মশা, অতিষ্ঠ নগরবাসী। কেবল শহর নয়, গ্রাম এলাকাতেও একই অবস্থা। মশক নিধনে প্রচণ্ড ঢিলেমি চলছে। এ সুযোগে বেড়েছে বড় বড় মশা। সন্ধ্যার পর মশা তাড়াতে তাড়াতে শিক্ষার্থীদের সময় যায়, বইয়ে মনোযোগ দিতে পারে না। সারা দিন রোজা থেকে শান্তিতে রাতের খাবার খেতে পারছেন না রাজধানীবাসী। মশার কামড় খেয়েই শেষ করতে হয় সাহরি। তেমনি কর্মজীবী মানুষ সারা দিন বাইরে কাজ করে ঘরে গিয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন না। বড় বড় মশা রাজধানীর সর্বত্র। ড্রেনে পানি জমে যাওয়ায় অথবা ছোট ছোট গর্তে জমে থাকা পানিতে কিউলেক্স জাতীয় বড় মশা জন্মাচ্ছে। ব্যাপকভাবে মশক নিধনের আবেদন করছেন নগরবাসী।

এদিকে কোন এলাকায় মশা বেশি, কোথায় কম অথবা কোন এলাকায় কোন ধরনের মশার বৃদ্ধি বেশি তা জানাতে প্রতি বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি জরিপ হয়ে থাকে। কিন্তু এ বছর এ ধরনের কোনো জরিপ করা হয়নি। সর্বশেষ গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এ ধরনের একটি জরিপ করা হয়েছিল। বেসরকারি উদ্যোগে ছোট আকারে একটি জরিপ হলেও এটা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না।

‘গত দেড় বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন আমলা দিয়ে চলার কারণে সিটি করপোরেশনের অন্যান্য কর্মসূচির মতো মশক নিধনেও চলেছে প্রচণ্ড ঢিলেমি’। নগর ব্যবস্থাপনায় যে শৈথিল্য দেখা দিয়েছে, এর প্রভাব পড়েছে মশক নিধন কার্যক্রমেও। সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতিশীলতা কমেছে, জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের তদারকি শিথিল হয়েছে এমন অভিযোগ করছেন নগরবাসী। মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ফগিং, লার্ভা ধ্বংস, জলাবদ্ধতা অপসারণ ও সচেতনতা কার্যক্রম সমন্বিতভাবে চালানোর কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় তা অনিয়মিত বা নামমাত্র পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। নগরবাসী বলছেন, কিউলেক্স ও এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে ধারাবাহিক অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতা যাচাই না থাকায় ব্যবহৃত কিটনাশকের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নাগরিকদের অভিযোগ, ওষুধ ছিটানো হলেও মশার উপদ্রব কমে না। এতে ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁঁকি বাড়ছে।

অবশ্য সব ধরনের মশাসহ ও ডেঙ্গু জীবাণুবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার কিছু নির্দেশ দিয়েছে। গত দুই দিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে মিটিং করেছেন নবনিযুক্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার শাখাওয়াত হোসেন। মিটিংয়ে অংশগ্রহণকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একজন জানিয়েছেন, রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি, কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই, জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশে মশক নিধনে যে কিটনাশক ব্যবহার হচ্ছে এর কার্যকারিতা আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখার নির্দেশও দিয়েছেন মন্ত্রী।

গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে যে সার্ভে করা হয়েছিল তাতে দেখা গেছে, ঢাকার মোট তিন হাজার ১৪৭টি বাড়ি ভিজিট করে ৪৬৩টি বাড়িতে মশার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৮.৮৮ শতাংশ বহুতল বিশিষ্ট ভবনে মশা পাওয়া গিয়েছিল। এ ছাড়া নির্মাণাধীন ভবনে মশা পাওয়া যায় ১৯.৬৩ শতাংশ, একক মালিকানাধীন ভবনে পাওয়া গিয়েছিল ৯.৮ শতাংশ, আধা পাকা ভবনে ৮.৮৮ শতাংশ এবং খালি প্লটে বা জমিতে পাওয়া যায় ২.৮ শতাংশ মশা।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান-নিপসমের কিটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. ছারওয়ার হোসেন বাংলাদেশে মশা নিধনের যে কিটনাশক ব্যবহার হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, এ কিটনাশকগুলো বছরের পর বছর বিনা পরীক্ষায় বাংলাদেশে ব্যবহার হচ্ছে। এগুলো কার্যকারিতা পরীক্ষা করেই ব্যবহার করা উচিত। তা না হলে মশা যেমন নিয়ন্ত্রণে আসবে না তেমনি সরকারের অর্থের অপচয় হবে। তিনি বলেন, এটা ছাড়াও অন্য দেশের মশক নিধনের ইনসেক্টিসাইড (কিটনাশক) বাংলাদেশের মশার ওপর কার্যকর নাও হতে পারে। অবশ্যই বাংলাদেশে ব্যবহারের আগে ল্যাবরেটরি টেস্টে উত্তীর্ণ হলেই করতে হবে।

মশা নিধনে বহুল প্রচলিত ফগিং বা ধোঁয়া অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানের মানুষ অভিযোগ করেছেন, ধোঁয়া দিলে মশা এখন আর মরে না, ধোয়া দিয়ে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর মাটিতে পড়ে থাকা মশাগুলো আবার উড়ে চলে যায়।