বৈশি^ক অস্থিরতায় বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তি অসম ও অনৈতিক : বিকেএমইএ সভাপতি

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বৈশি^ক অস্থিরতায় বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। প্রতিষ্ঠান বলেছে, গত ছয় বছরে বাংলাদেশকে অত্যন্ত অস্থির বৈশি^ক পরিবেশের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। এর প্রথম ধাক্কাটি আসে কোভিড-১৯ মহামারী থেকে, এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য উত্তেজনা ও ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত থেকে নতুন করে বৈশি^ক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গতকাল রোববার পিআরআইয়ের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মাসিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা শীর্ষক সেমিনারে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। সংস্থাটির চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে অর্থনীতিবিদরা বক্তব্য দেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তিকে অসম ও অনৈতিক বলে মন্তব্য করেন নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি এই চুক্তি পর্যালোচনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের চুক্তিকে অনৈতিক আখ্যা দিয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চুক্তিতে বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্র কোথাও নিষেধাজ্ঞা দিলে, তা আমাদের মানতে হবে। এখন তারা আর ইসরাইল মিলে মধ্যপ্রাচ্যে অত্যাচার চালাচ্ছে। আবার তারা যে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে, সেটাও কি আমাদের মানতে হবে। এটা অনৈতিক।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক বাতিল হওয়ায় এখন সবার ওপর সমান ১৫ শতাংশ শুল্ক। তার প্রশ্ন, তাহলে এখানে আমাদের বাড়তি সুবিধা কোথায়। কেবল দেশটি থেকে সুতা আমদানি করলে সুবিধা আছে; কিন্তু এই সুবিধার জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বড় শর্ত মানব কেন। তাই নতুন সরকারের চুক্তি পর্যালোচনা করা উচিত।’

রফতানি খাতের নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো টানা সাত মাস রফতানি নেতিবাচক ছিল না। হয়তো দুই তিন মাস এমনটা হয়েছে। আর আগামী জুন পর্যন্ত রফতানি প্রবৃদ্ধির এই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে বলে ব্যবসায়ী মহলের ধারণা। কিন্তু এরপর যে রফতানি ইতিবাচক হবে, তেমন কোনো পূর্বাভাস নেই।

পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান তার মূল প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশ নিজেও উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, মাত্র দুই বছরে তিনটি সরকার পরিবর্তন হয়েছে, যার ফলে নীতিগত অনিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক খাত এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সব ক্ষেত্রেই চাপের মুখে পড়েছে, যা অস্বাভাবিক নয়।”

ড. আশিক আরো উল্লেখ করেন যে, দেশের আর্থিক ও রাজস্ব খাতের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এই চ্যালেঞ্জকে আরো জটিল করে তুলেছে, যা সরকারকে এসব ধাক্কার কার্যকর মোকাবিলা করতে সীমাবদ্ধ করে।

তিনি বলেন, নবনির্বাচিত সরকারের জন্য অগ্রাধিকার হওয়া উচিত স্পষ্ট, রাজস্ব ও আর্থিক খাতে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার এবং কৌশলগত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা, যাতে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অস্থিরতার মোকাবেলায় দেশ আরো প্রস্তুত থাকে।

ড. জাইদী সাত্তার বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার এমন সব উপাদান রয়েছে যা “সম্ভাব্যভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।”

এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ স্থগিত করার জন্য জাতিসঙ্ঘের কাছে করা অনুরোধ এখন আরো শক্তিশালী যুক্তি পেয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করেছে- এই যুক্তিতে অবিলম্বে উত্তরণের ওপর জোর দেয়া জাতিসঙ্ঘ ব্যবস্থার জন্য খুব যুক্তিসঙ্গত হবে না।

তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় যেমন উত্তরণ স্থগিত করা হয়েছিল, তেমনি এবারো সময়সীমা এক বা দুই বছর বাড়ানো হতে পারে।

বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ব্যবস্থার সাথে যুক্ত, যা দেশের অর্থনৈতিক গতিপথকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করবে।

প্রথমটি হলো যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য ব্যবস্থা, যা এখনো পুরোপুরি অনুমোদিত না হলেও বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে কিছু অঙ্গীকার করেছে।’