যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজার রাফাহ ক্রসিং বন্ধ রাখতে ইসরাইলের অজুহাত

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজায় থেকে যাওয়া সর্বশেষ ইসরাইলি সেনার লাশ উদ্ধার না হওয়ার অজুহাতে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ রেখেছে ইসরাইল। লাশটি উদ্ধারের অভিযান শেষ হলেই মিসরের সাথে রাফাহ ক্রসিংয়ের একটি ‘সীমিত পুনঃ উদ্বোধন’ করার অনুমতি দেবে বলে জানিয়েছে দখলদার রাষ্ট্রটি। আবার এই সীমান্ত খোলা হবে শুধু ‘একমুখী’ চলাচলের শর্তে। এ নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এ খবর জানিয়েছে আলজাজিরা।

রোববার রাতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে এ ঘোষণা দেয়া হয়। এমন সময়ে এ ঘোষণা এলো যখন গাজাজুড়ে ইসরাইলি বাহিনীর নতুন হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় শোক পালন করছেন ফিলিস্তিনিরা। নেতানিয়াহুর কার্যালয় দাবি করেছে, রাফাহ সীমান্ত পুনরায় চালুর বিষয়টি মূলত হামাসের পক্ষ থেকে ‘শতভাগ প্রচেষ্টার’ ওপর নির্ভরশীল। ইসরাইলি পুলিশ কর্মকর্তা রান গভিলির লাশ খুঁজে বের করে ফেরত না দেয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া কার্যকর হবে না।

গত অক্টোবর মাসে মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রাথমিক ধাপেই এই সীমান্ত খোলার কথা ছিল। বর্তমানে ইসরাইলি সেনাবাহিনী উত্তর গাজার ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখাসংলগ্ন একটি কবরস্থানে গভিলির লাশের খোঁজে ব্যাপক তল্লাশি চালাচ্ছে।

অন্যদিকে, হামাস বলেছে তারা ইতোমধ্যে ‘সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার’ সাথে রান জি গভিলির লাশের অবস্থান ইসরাইলকে জানিয়ে দিয়েছে। হামাসের সামরিক শাখা কাসসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা চুক্তি অনুযায়ী আমাদের সমস্ত বাধ্যবাধকতা পূরণ করেছি। এই বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখার কোনো আগ্রহ আমাদের নেই।’ তিনি ইসরাইলকে চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত গাজার অস্থায়ী প্রশাসক ‘অন্তর্বর্তীকালীন ফিলিস্তিনি কমিটির’ প্রধান আশি শাত বৃহস্পতিবার জানিয়েছিলেন, রাফা ক্রসিং চলতি সপ্তাহে খুলে দেয়া হতে পারে। গাজার ২০ লাখেরও বেশি বাসিন্দার ছিটমহলটির বাইরে যাওয়ার ও ফিরে আসার একমাত্র পথ এই রাফা ক্রসিং। ২০২৪ সাল থেকেই রাফাহ ক্রসিংয়ের গাজা অংশটি ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দখলে রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় সীমান্তটি ‘উভয় দিকে’ খুলে দেয়ার কথা থাকলেও নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, এটি শুধু ‘পথচারী চলাচলের’ জন্য এবং ‘ইসরাইলি পরিদর্শন ব্যবস্থার’ অধীনে সীমিতভাবে খোলা হবে। চলতি মাসে ওয়াশিংটন ঘোষণা করেছে, গাজা শান্তি পরিকল্পনা এর দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশ করেছে। এই পর্বে ইসরাইল গাজা থেকে আরো সেনা প্রত্যাহার করবে এবং হামাস অঞ্চলটির প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ইসরাইলের এই ‘সীমিত’ প্রবেশাধিকারের আসল উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে স্থায়ীভাবে বিতাড়িত করা। ‘দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি’ বইয়ের লেখক অ্যান্থনি লোওয়েনস্টাইন আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরাইল চাইছে ফিলিস্তিনিরা চলে যাক, কিন্তু তারা যেন আর ফিরে আসতে না পারে। মিসরে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি গত দুই বছর ধরে আটকা পড়ে আছে, যারা নিজ দেশে ফিরতে চায়। কিন্তু ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ থাকলে তাদের ফেরা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে গাজায় একটি ‘টেকনোক্র্যাট ফিলিস্তিনি কমিটি’ এবং ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। যদিও হামাস স্পষ্ট জানিয়েছে, দখলদারিত্ব চলাকালে তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না।

গাজায় তিন মাসে ১৩০০ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে ইসরাইল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে আপাতত দৃষ্টিতে যুদ্ধবিরতি চলছে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর সে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবার পর থেকে অন্তত ১ হাজার ৩০০ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে ইসরাইল। এর মধ্যে ৪৩০ বার বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি চালানো এবং ৬০০ বারের বেশি বোমাবর্ষণ বা গোলাবর্ষণের ঘটনা রয়েছে। আলজাজিরার প্রকাশিত খবরের তথ্য মতে, অন্তত ৬৬ বার ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরে আবাসিক এলাকায় হামলা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। ২০০ বারের বেশি মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া গত এক মাসে গাজা থেকে অন্তত ৫০ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরাইল। একই সাথে ইসরাইল গাজা উপত্যকায় অত্যাবশ্যক মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা অব্যাহত রেখেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস করছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর গাজায় ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্প ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব উন্মোচন করেন যা ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়। প্রস্তাবে গাজায় আটক থাকা অবশিষ্ট বন্দীদের মুক্তি, অবরুদ্ধ উপত্যকায় সম্পূর্ণ মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি এবং তিন ধাপে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলের বিমান ও স্থল হামলা অব্যাহত

অক্টোবর ১০ থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ গাজার বিভিন্ন এলাকায় একযোগে বিমান হামলা, কামান থেকে গোলাবর্ষণ এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। উত্তর গাজার জাবালিয়া শহরের পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি কামান থেকে একাধিক স্থানে গোলা নিক্ষেপ করা হয়। একই সময়ে এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। মধ্য গাজার আবু আল-আজিন এলাকায় একাধিক বিমান হামলার পাশাপাশি কামান হামলাও চলতে থাকে।

পশ্চিম তীরে নাবলুস ও বালাতা শরণার্থী শিবিরে ধরপাকড়

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সামরিক অভিযান ও ধরপাকড় জোরদার হয়েছে। নাবলুস শহরের বালাতা শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলি সেনারা হানা দিয়ে বাড়িঘর তল্লাশি ও ভাঙচুর চালিয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর আনাদোলু এজেন্সির। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় সেনারা ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের মারধর করে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, তাদের চিকিৎসক দল অন্তত পাঁচজন আহত ফিলিস্তিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। এ ছাড়া জেরুসালেমের উত্তরে কালান্দিয়া শরণার্থী শিবির ও কাফর আকাব শহরে বুলডোজারসহ ইসরাইলি বাহিনী অভিযান চালায়। জেরুসালেম গভর্নরেটের এক বিবৃতিতে বলা হয়, কালান্দিয়ার এল-মাতার সড়কে ব্যাপক সেনা সমাবেশ দেখা গেছে এবং বিচ্ছিন্নতা প্রাচীরের একটি অংশ সরানোর চেষ্টা চলছে। এই অভিযানের কারণে প্রধান সড়ক বন্ধ হয়ে যায় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব অভিযান ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবনকে চরমভাবে ব্যাহত করছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে ইসরাইলি অভিযান, গ্রেফতার ও সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, এসব পদক্ষেপ পশ্চিম তীর দখলকে স্থায়ী রূপ দেয়ার পথ তৈরি করছে।

‘ইয়েলো লাইনে’ সঙ্কুচিত হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের জীবন

গাজা শহরের পূর্বপ্রান্তে হলুদ রঙে চিহ্নিত কংক্রিট ব্লকের কয়েক মিটার দূরেই একটি ছোট তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি জাইদ মোহাম্মদ ও তার পরিবার। এই তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ গাজার যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরাইলি সেনাদের পুনঃমোতায়েনের সীমারেখা, যা কার্যত একটি অভ্যন্তরীণ সীমান্তে পরিণত হয়েছে। খবর আলজাজিরার।

ইসরাইলি সামরিক মানচিত্র অনুযায়ী, এই রেখা গাজার পূর্ব সীমান্ত থেকে ১.৫ থেকে ৬.৫ কিলোমিটার ভেতরে বিস্তৃত এবং উপত্যকার প্রায় ৫৮ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে গাজা কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত- একটি ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল এবং অন্যটি সীমিত চলাচলের অনুমতি পাওয়া এলাকা। জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, ইসরাইলের দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে গাজার ৮০ শতাংশের বেশি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ইয়েলো লাইনের কাছাকাছি বসবাসকারীরা নিয়মিত গোলাবর্ষণ, ড্রোন ও ট্যাংকের শব্দে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের অন্ধকারে সেনাদের ফ্লেয়ার আলো পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, এই পরিবর্তনশীল সামরিক রেখা মানুষের চলাচল, জীবিকা ও মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে। এটি মানচিত্রে স্পষ্ট না হলেও, গাজার দৈনন্দিন জীবনে এক অদৃশ্য কিন্তু কঠোর বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

বিদেশী সংবাদমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরো বাড়াল ইসরাইল

বিদেশী সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ আরো কড়াকড়ি করেছে ইসরাইল। দেশটির সরকার আলজাজিরা ও আল মায়াদিনের ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেল ৯০ দিনের জন্য বন্ধের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। খবর মিডলইস্ট আই। এর আগে এসব গণমাধ্যমের টেলিভিশন সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ইসরাইলের যোগাযোগমন্ত্রী শ্লোমো কারহি বলেন, ‘ইসরাইলের শত্রুদের কণ্ঠস্বর আমরা সরিয়ে দেব।’

২০২৪ সালে পাস হওয়া জরুরি আইনের মাধ্যমে সরকার বিদেশী গণমাধ্যম বন্ধ করার ক্ষমতা পায়। পরে সেই আইন স্থায়ী করা হয়, যার ফলে আদালতের আদেশ ছাড়াই সম্প্রচার বন্ধ ও সরঞ্জাম জব্দ করা সম্ভব হচ্ছে। সাংবাদিকদের সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন সিপিজে বলেছে, গাজা যুদ্ধের সত্য তথ্য আড়াল করতেই ইসরাইল এই পদক্ষেপ নিচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা উনরাও জানিয়েছে, গাজা বর্তমানে সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান। গাজার ভেতরে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় স্থানীয় সাংবাদিকরাই একমাত্র তথ্যের উৎস। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে, সংবাদমাধ্যম দমন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য গুরুতর হুমকি।