রোজার এক মাস আগেই নিত্যপণ্যের বাজার চড়া, আমদানি বাড়লেও কমছে না দাম

Printed Edition

শাহ আলম নূর

পবিত্র রমজান শুরুর প্রায় এক মাস বাকি থাকলেও এরই মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার চড়া হতে শুরু করেছে। আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, ছোলা, আদা ও রসুনসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে রোজার আগে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কার্যকর বাজার মনিটরিংয়ের অভাবে মুনাফালোভী একটি শ্রেণী সুযোগ নিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গত এক সপ্তাহে একাধিক পণ্যের দাম বেড়েছে। পাইকারি বাজারে ছোলার দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে মানভেদে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অ্যাংকর ডালের দাম বেড়ে কেজি ৪৫ থেকে ৪৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রতি মণ (৪০ কেজি) চিনির দাম এক লাফে ১০০ টাকা বেড়ে তিন হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। একই সাথে পাম অয়েলের দাম বেড়ে মণ প্রতি পাঁচ হাজার ৯৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আদা ও রসুনের দামও ঊর্ধ্বমুখী, যার প্রভাব এরইমধ্যে খুচরা বাজারে পড়তে শুরু করেছে।

এ দিকে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যে দেখা যায়, রাজধানীর খুচরা বাজারেও গত এক সপ্তাহে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল ও আদার দাম বেড়েছে। টিসিবির তথ্যে বলা হয়েছে, বাজারে সরবরাহ থাকলেও দামের এই ঊর্ধ্বগতি স্বাভাবিক নয়, যা রোজার আগে ভোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার রমজান উপলক্ষে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে ভোগ্যপণ্য আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে নিত্যপণ্য আমদানির জন্য যে ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছিল, সেসব পণ্য এখন দেশে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ জট, লাইটার সঙ্কট ও খালাস প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে এসব পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং তার সুযোগ নিয়ে পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ছে।

দেশের অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রমজান এলেই প্রতি বছর একই চিত্র দেখা যায়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, প্রতি বছরই রমজানের আগে পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা কোনো না কোনো অজুহাত দাঁড় করিয়ে মূল্য বাড়ায়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে যে কঠোর মনিটরিং দরকার, তা কার্যকরভাবে দেখা যায় না। তিনি বলেন, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, পাইকারি বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং তদারকি জোরদার না করা হলে রমজান শুরু হলে মূল্যচাপ আরো বাড়তে পারে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, রমজান শুরু হওয়ার আগেই বাজারে দাম বাড়তে শুরু করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, আসলে ব্যবসায়ীরা রমজানকে টার্গেট করেই মুনাফার পরিকল্পনা করে। সরকার বলছে পর্যাপ্ত পণ্য আমদানি হয়েছে, যদি তা সত্যি হয়, তাহলে এখন দাম বাড়বে কেন। তিনি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হলেও বাস্তবে কার্যকর মনিটরিং দেখা যাচ্ছে না। রমজানে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে শতাধিক পণ্যবাহী জাহাজে ৪৫ লাখ টনের বেশি ভোগ্যপণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, ডাল, ভোজ্যতেল ও চিনি যেগুলো রমজানে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন। বন্দরে দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য আটকে থাকায় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মো: জামশেদ আরেফিন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটার জাহাজের সঙ্কটের কারণে পণ্য খালাস করতে পারছি না। বন্দরে ছোলা, গম, মসুর ও মটর ডাল আটকে আছে। রমজান শুরু হওয়ার খুব বেশি সময় নেই। দ্রুত খালাস সম্ভব হলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দামের ওপর চাপ কমবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, আসন্ন রমজানে বাজার স্থিতিশীল রাখতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নিত্যপণ্য আমদানির জন্য আগেভাগেই এলসি খোলা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে খোলা এলসির পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে ৩৬ শতাংশ, চিনি ১১ শতাংশ, মসুর ডাল ৮৭ শতাংশ, ছোলা ২৭ শতাংশ, মটর ডাল ২৯৪ শতাংশ এবং খেজুরের ক্ষেত্রে ২৩১ শতাংশ বেশি। সেপ্টেম্বরে মোট ৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার এবং অক্টোবরে ৫ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়, যা আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তুতিরই ইঙ্গিত দেয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, রমজান সামনে রেখে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার একাধিক নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের আমদানিতে শুল্ক ও কর যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা হয়েছে, যাতে আমদানিকারকদের ব্যয় কমে এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ে। তবে বাস্তবে এসব উদ্যোগের সুফল এখনো ভোক্তারা পাচ্ছেন না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানির পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত খালাস, পাইকারি ও খুচরা বাজারে কঠোর তদারকি এবং মজুদদারির বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার না করলে রমজানের বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে। অন্যথায় রোজার শুরুতেই নিত্যপণ্যের দামে নতুন করে চাপ তৈরি হবে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়াবে।