ফের ৭০০ কোটি টাকা ছাড়াল ডিএসইর লেনদেন
ব্যাংকিং খাতই এগিয়ে নিচ্ছে লেনদেন ও সূচক
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
প্রায় চার মাসের মাথায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন আবার ৭০০ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করেছে। গতকাল সোমবার সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসে ডিএসই মোট ৭৪৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে। এর আগে সর্বশেষ গত বছরের ৭ অক্টোবর ৭০০ কোটির ওপরে ছিল পুঁজিবাজারটির লেনদেন। পরবর্তীতে বাজারে ধারাবাহিক দরপতনের শিকার হলে লেনদেন হ্রাস পেতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ ডিসেম্বর বাজারটির লেনদেন নেমে আসে ৩০০ কোটির ও নিচে। তবে নতুন বছরের শুরুতে বাজার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটে। এ সময় মন্দা কাটিয়ে স্বাভাবিক আচরণ ফিরে পায় বাজার যার ফলশ্রুতিতে সূচক ও লেনদেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৫৪ দশমিক ২৯ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। আগের দিনের ৫ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ২৪৭ দশমিক ৭৫ পয়েন্টে। এটি গত প্রায় চার মাসের মধ্যে ডিএসই সূচকের সর্বোচ্চ অবস্থান। গত বছরের ৯ অক্টোবরের পর আর এ পর্যায়ে পৌঁছেনি সূচকটি। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২০ দশমিক ৫৬ ও ১২ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ১১৩ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। এদিন বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৮৪ দশমিক ১৮ ও ৭৪ দশমিক ৪২ পয়েন্ট।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নতুন করে সক্রিয় হচ্ছেন। এর আগে টানা মন্দায় ব্যাপকভাবে লোকসানের মুখে বিনিয়োগকারীরা হতাশায় দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এ মুহূর্তে বাজার ভালো আচরণ করায় সাইড লাইনে থাকা তাদের একটি অংশ ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছেন। তবে তারা মনে করেন এখনো বাজারকে পুরোপুরি আস্থায় নিতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। তবে বাজারের এ আচরণ অব্যাহত থাকলে ক্রমান্বয়ে বাজারের ওপর আস্থাশীল হয়ে উঠবেন এবং ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীদের আরো অনেকে বাজারে যুক্ত হবেন এমনটিই মনে করেন তারা।
গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকের উন্নতি ঘটেছে। এ দুই দিনে ডিএসই সূচকের উন্নতি ঘটেছে ৯৩ পয়েন্টের বেশি। লেনদেনের প্রথম আধঘণ্টায় ডিএসইর প্রধান সূচকটি পৌঁছে যায় ৫ হাজার ২৪৯ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকেটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৫৬ পয়েন্টের বেশি। এ সময় মৃদু বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে দুপুর ১২টার দিকে সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ২২৫ পয়েন্টে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে প্রথমদিকের এ চাপ সামলে নেয় বাজারটি। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে বাজায়। পরবর্তীতে আর কোনো বিক্রয়চাপ না আসায় সূচকের বড় ধরনের উন্নতিতে লেনদেন শেষ করে বাজারটি।
এদিকে দিনের বাজার আচরণের প্রধান দিকটি ছিল ব্যাংকিং খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রথম ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ তিনটি কোম্পানি ছিল ব্যাংকিং খাতের। লেনদেনে যেমন খাতটি এগিয়ে ছিল তেমনি মূল্যবৃদ্ধিতেও গতকাল এ খাত অন্য খাতগুলোকে ছাড়িয়ে যায়। পাশাপাশি সম্প্রতি অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা কোম্পানির মধ্যে যেগুলো ভালো আয় দেখিয়েছে সেগুলোতেই আগ্রহ দেখিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ তিনটি কোম্পানিই ছিল ব্যাংকিং খাতের। এ ছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সিমেন্ট, সিরামিকস, ওষুধ ও রসায়ন, টেক্সটাইল, টেলিকমিউনিকেশন ও বিবিধ খাতের কোম্পানিগুলোও সূচকের উন্নতিতে ভূমিকা রেখেছে গতকাল। এ সময় দরপতনের শিকার ছিল চামড়া, প্রকৌশল, সেবা ও আইটি খাতের কোম্পানিগুলো। আর এভাবে গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির বেশিরভাগ মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় জায়গা করে নেয়। ঢাকায় লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৯০টি কোম্পানির মধ্যে ২১৫টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারিয়েছে ১০৭টি। অপরিবর্তিত ছিল ৬৮টি কোম্পানির দর। অপর দিকে চট্টগ্রামে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৮৩টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ১০১টি মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, ৫৭টি দর হারায় এবং ২৫টি সিকিউরিটিজের দর অপরিবর্তিত থাকে।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ব্যাংকিং খাতের ব্র্যাক ব্যাংক। ২৯ কোটি ৮১ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৩৮ লাখ ৬১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় ১ কোটি ৩ লাখ ৬৯ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিটি ব্যাংক। লেনদেনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইসলামী ব্যাংক, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ট্রাস্ট ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস ও নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস।
এদিন মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ কোম্পানি ছিল ইসলামী ব্যাংক। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মিডল্যান্ড ব্যাংক, ফার্মা এইড, এবি ব্যাংক, এস্কয়্যার নিটিং, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, বিডি থাই ফুডস ও এনআরবিসি ব্যাংক।
গতকাল ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে ছিল মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ। কোম্পানিটি ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ দর হারায় গতকাল। ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ দর হারিয়ে তালিকার দ্বিতীয় স্থানটি দখলে রাখে ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। দরপতনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে নিউলাইণ ফ্যাশন্স, জিবিবি পাওয়ার, এপেক্স ট্যানারি, এমারেল্ড অয়েল, সিএপিএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, হামিদ ফেব্রিক্স লিমিটেড, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ।