এলপিজি নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড
কৃত্রিম সঙ্কট, নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা ও বাজার কারসাজিতে বিপর্যস্ত রান্নাঘর
Printed Edition
শাহ আলম নূর
দেশজুড়ে অরাজক পরিস্থিতিতে এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সঙ্কট সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের জীবনকে কার্যত অচল করে তুলেছে। পাইপলাইনে গ্যাস না থাকা এবং বাজারে এলপিজির অপ্রতুল সরবরাহের কারণে অসংখ্য পরিবার নিয়মিত রান্না করতে পারছে না। এই সঙ্কটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছেন নারী ও শিশুরাÑ যারা প্রতিদিনের রান্না, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার সাথে সরাসরি যুক্ত।
সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার বার্তা দেয়া হলেও মাঠের বাস্তবতায় তার প্রতিফলন নেই। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজির সরবরাহ ও দাম নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমদানি পরিকল্পনা, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বাজার তদারকির ব্যর্থতার সুযোগে একটি কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয়েছে, যার দায় শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
রাজধানীতেও রান্নাঘর অচল
ঢাকার বহু এলাকায় যেখানে আগে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ ছিল, সেখানে এখন দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকে না। অনেক পরিবার সারা দিন গ্যাস না পেয়ে রাত গভীর হলে বা বিকল্প উপায়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। ডেমরা এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত এক মাস ধরে এলপিজির অভাবে রান্না অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। দোকানে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, আর যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে তার দামও আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে হোটেল বা বাইরের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন, যা ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এলপিজি না পেয়ে রাজধানীর অনেক বাসিন্দা বাধ্য হয়ে ইন্ডাকশন বা বৈদ্যুতিক চুলা কিনছেন। ভোক্তারা বলছেন, গ্যাস সিলিন্ডারের তুলনায় এসব চুলার দাম বেশি হলেও রান্না চালু রাখার জন্য বিকল্প পথ হিসেবে সেটিই বেছে নিতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপও তৈরি হচ্ছে।
সরকারি দাম, বাস্তব বাজার-দুই মেরু
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারির জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত খুচরা দাম এক হাজার ৩০৬ টাকা, যা আগের মাসের তুলনায় ৫৩ টাকা বেশি। কিন্তু বাস্তব বাজারে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকাসহ বন্দর নগরীগুলোতে একই সিলিন্ডার এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও সরকারি দামের দ্বিগুণেও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার সিলিন্ডার অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দামের চেয়ে ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য প্রতিদিনের রান্না ব্যয় সামাল দেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আমদানিনির্ভরতা ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা
বাংলাদেশে এলপিজির বাজার প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। মোট চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ এলপিজি আমদানি করা হয়, আর স্থানীয় উৎপাদন মাত্র ২ শতাংশ। সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে ২০২৫ সালে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ টন, যা সামগ্রিক চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
তবে সমস্যা তৈরি হয়েছে আমদানির পরবর্তী পর্যায়েÑ বিতরণ, সংরক্ষণ ও বাজার তদারকিতে। বড় কয়েকটি কোম্পানি ডলার সঙ্কট ও এলসি খোলার জটিলতার কারণে আমদানি কমিয়ে দিয়েছে বা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এলপিজিকে শিল্প কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করে এলসি সুবিধার মেয়াদ বাড়িয়েছে, তবুও বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিক সুবিধা পাচ্ছে না।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ প্রকৃত অর্থে সঙ্কটের পর্যায়ে না গেলেও ডিলার ও পরিবেশক পর্যায়ে কৃত্রিম চাপ তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে। দুর্বল বাজার নজরদারির সুযোগে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
নারীদের কাঁধে বাড়তি বোঝা
এলপিজি সঙ্কটের ফলে বহু পরিবার আবার মাটির চুলা বা বিকল্প জ্বালানির দিকে ফিরছে, আবার কেউ কেউ পুরোপুরি রান্না বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নারীদের ওপর, যারা ঘরের রান্নাঘরের দায়িত্ব পালন করেন। গ্যাস না থাকায় সারা দিনে একবেলা খাবার প্রস্তুত করাও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। শিশুদের খাবার ঠিক মতো তৈরি করা যাচ্ছে না, ফলে পুষ্টিহীনতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে, যা সামনে আরো বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করবে।
সমন্বয়হীন নীতির মাশুল
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতি নির্ধারণ, আমদানি অনুমোদন, বাজার তদারকি ও ভোক্তা সুরক্ষার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও ভয়াবহ সঙ্কটে পরিণত হতে পারে। এলপিজি সঙ্কট তারই উদাহরণ, যার মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষÑবিশেষত নারী ও শিশুরা।