এসি ল্যান্ডের অপকর্ম তুলে ধরায় গরুর হাটে অনৈতিক হস্তপে
Printed Edition
নিকলী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি
সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার ও নিকলী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতীক দত্তের বিরুদ্ধে অপকর্মের অভিযোগ তুলে ধরে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ করায় একাধিক সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।
পাশাপাশি তার নির্দেশে একজন সাংবাদিকের ইজারাকৃত প্রায় চার কোটি টাকা মূল্যের একটি বৈধ গরুর হাট নিয়মবহির্ভূতভাবে বন্ধ ও ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২২ জানুয়ারি ২০২৬ এসি ল্যান্ড প্রতীক দত্ত ব্যক্তিগত প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেন।
২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কিশোরগঞ্জ জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ গরুর হাট বিনা নোটিশে যৌথ বাহিনীর সহযোগিতায় উচ্ছেদ করা হয়। কখনো স্থানীয় বিদ্যালয়ের পড়াশোনার ব্যাঘাত, আবার কখনো ভিন্ন ভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
স্থানীয়দের দাবি, এতে হাটটির দীর্ঘদিনের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হয়েছে এবং তাৎণিকভাবে অন্তত ২০ লাখ টাকার আর্থিক তি হয়েছে। এ তির প্রভাব আগামী কয়েক বছর ধরে বহন করতে হবে, যা এলাকার মানুষের জন্য অপূরণীয় তির শামিল। হাট চলাকালে এমন আকস্মিক অভিযানে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযানের সময় আনোয়ার, আল হাকিম, আঞ্জু ও আল আমিন নামের চারজনকে গ্রেফতার করে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে আটকে রাখা হয়। একই সাথে ইজারাদারকে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে হাজির করানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। ইজারাদার ঘটনাকালে ব্যক্তিগত কাজে বাইরে অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে। পরোভাবে বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে সাজানো মামলার হুমকিও দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে সন্ধ্যায় মুচলেকার মাধ্যমে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেয়া হয়। দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এ ঘটনায় হাটের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকের চোখে অশ্রু নেমে আসে। হাজার হাজার মানুষের শ্রম, ঘাম ও অর্থের বিনিময়ে গড়ে ওঠা এই হাট ভেঙে দেয়ায় অনেকেই বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন। বহু পরিবারে সে দিন দুপুর এমনকি রাতের খাবারও ঠিকমতো জোটেনি। হুমকি ও গ্রেফতারের আতঙ্কে অনেকেই শীতের রাতে ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেন বলেও জানা গেছে।
এই বৈধ গরুর হাটকে কেন্দ্র করে এলাকাসহ দূর-দূরান্তের হাজার হাজার মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা হয়ে থাকে। সাংবাদিক আলি জামশেদ ইজারা নেয়ার পর হাটটির ব্যাপ্তি আরো বেড়েছে বলে সরেজমিন দেখা যায়। জানা গেছে, ২০২৪ সালে সর্বশেষ ইজারা মূল্য ছিল প্রায় ৩০ লাখ টাকা। চলতি মৌসুমে সিন্ডিকেট ভেঙে সরকারের কোষাগারে তিন কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা পড়েছে।
তবে হাট পরিচালনা কর্তৃপরে অভিযোগ, মেইনটেন্যান্সের নামে আদায়কৃত অর্থের একটি টাকাও উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়নি। উল্টো প্রশাসনের প থেকে বিভিন্ন দিবস ও উন্নয়নের নামে কোনো ডকুমেন্টেশন ছাড়াই মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের প্রশ্ন তোলায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে।
বুধবারের এই অনাকাক্সিত হস্তেেপর ফলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে তীব্র বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিক্রেতারা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অনেকেই প্রশাসনের আচরণে আহত হন এবং কারো কারো নগদ অর্থ হারিয়ে যায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৮ বছর ধরে বিদ্যালয় মাঠের আশপাশের পরিত্যক্ত জায়গাসহ হাটটি পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক ইজারা নেয়ার পর গরু রাখা হয় বিদ্যালয় মাঠ ও সীমানার বাইরে। এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপ কিংবা অভিভাবকদের কোনো আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন শিক ও স্থানীয় অভিভাবকরা। শিার্থীদের উপস্থিতিও প্রতিদিনের মতোই স্বাভাবিক ছিল।
ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আঠারবাড়িয়া গুপিরা বাজারটি ৭৩৭ দাগে মোট ৩৬ শতাংশ জায়গার ওপর অবস্থিত এবং দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন দোকানপাট রয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে এটি গরুর হাটে রূপান্তরিত হয়। হাটের সম্প্রসারণের প্রয়োজনে আশপাশের ব্যক্তিগত জমি ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মূল বাজারকে পেরিফেরির আওতায় পাঠানো হয়েছে বলেও জারইতলার ভূমি নায়েব হবি আহমেদ বুলবুল স্বীকার করেন।
আরআর ও আরএস রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৭৫৩ দাগে জেলা প্রশাসকের নামে ১ একর ২ শতাংশ জমি খেলার মাঠ হিসেবে নথিভুক্ত এবং ৮৩৭ দাগে ইউনিয়ন কমপ্লেক্স ভবন অবস্থিত। ওই সরকারি জমিতে আঠারবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ভবন ও সেমি পাকা টিনশেড ঘর রয়েছে; অর্থাৎ সরকারি জমির পুরো অংশই সরকারি স্থাপনার দখলে। হাট পরিচালনার েেত্র বুধবার যে অংশ ব্যবহার করা হচ্ছিল, তা ছিল ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি।
স্থানীয়দের দাবি, এত দিন এই ব্যক্তিগত জমি নিয়ে কোনো আপত্তি না উঠলেও বর্তমান এসি ল্যান্ড প্রতীক দত্ত এটিকে ইস্যু বানিয়ে যৌথ বাহিনী নিয়ে বিনা নোটিশে অনৈতিক হস্তপে করেন, যা সম্পূর্ণ অনাকাক্সিত।
ইজারাদার সাংবাদিক আলি জামশেদ বলেন, স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য পরিকল্পিতভাবে বাজার ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে। সরকারের যেখানে ৩০ লাখ টাকার স্থলে প্রায় চার কোটি টাকা রাজস্ব আসছে এবং স্থানীয় মানুষও উপকৃত হচ্ছে, সেখানে এ ধরনের অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই তিনি মনে করেন। তিনি সুষ্ঠু তদন্ত, তিপূরণ ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
এ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, এসি ল্যান্ড প্রতীক দত্ত হাটের মাইক হাতে নিয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন- গরু দ্রুত সরিয়ে না নিলে তা খাস কালেকশনে নেয়া হবে। চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের আচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নিকলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তির সাথে ২২ জানুয়ারি সাংবাদিক পরিচয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি দেখা করে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লার বক্তব্য জানতে বিকেল ৪টার দিকে ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।