ষড়যন্ত্র ঠেকাতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা

Printed Edition

এস এম মিন্টু

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে যখন নির্বাচনী উত্তাপ বাড়ছে, ঠিক তখনই নির্বাচন বানচালের গভীর ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুপ্ত হামলা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং সন্ত্রাসী তৎপরতার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সতর্কতায় যাচ্ছে রাষ্ট্র। প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলেও ভোটের মাঠে স্বস্তির পরিবর্তে বাড়ছে শঙ্কা, গুজব ও অনিশ্চয়তা। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভাষ্য- একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যাহত করার চেষ্টা করছে, যার পেছনে রয়েছে ‘পতিত স্বৈরাচারের’ দোসর, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং অপরাধী গোষ্ঠীর সমন্বিত তৎপরতা।

এই প্রোপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত নির্বাচনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপে ভোট নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীসহ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ড্রোন, ডগ স্কোয়াড, বডি ক্যামেরা ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির নজিরবিহীন নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার।

নির্বাচন ঘিরে অশনি সঙ্কেত : গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন বানচালের প্রধান কৌশল হিসেবে কয়েকটি পথ বেছে নেয়া হয়েছে- রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও গুপ্ত হামলার মাধ্যমে আতঙ্ক ছড়ানো, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি, ককটেল বিস্ফোরণ ও অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখিয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিকল্পিত গুজব ছড়ানো। বিশেষ করে নগরীর বস্তি এলাকা ও শিল্পাঞ্চলগুলোকে সম্ভাব্য ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঢাকার কড়াইল, মিরপুর, গাজীপুরের টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জের চনপাড়া, চট্টগ্রামের কয়েকটি বস্তি ও আশপাশের এলাকায় মাদক সিন্ডিকেট ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নির্বাচনের আগেই শক্তি প্রদর্শনে নেমেছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এসব এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল ও দেশীয় অস্ত্রের মজুদ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উদ্বিগ্ন।

উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, স্পষ্ট বার্তা : এই উদ্বেগজনক বাস্তবতায় মঙ্গলবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে নির্বাচন প্রস্তুতি ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে তিন বাহিনী প্রধান, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম স্পষ্ট করে জানান, ৩০০ আসনেই একই দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা অনিশ্চয়তার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচন যেন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয় এবং দেশ গর্ব করে বলতে পারে- এটি একটি ভালো নির্বাচন, এটাই প্রধান উপদেষ্টার প্রত্যাশা।’

রাজনৈতিক বক্তব্যে অনিশ্চয়তা : তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নির্বাচন পরিবেশকে আরো সংবেদনশীল করে তুলছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমাদের সমাজের একটি অংশ চায় না নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হোক।’ এই মন্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।

অন্য দিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচন কমিশনের নিরপেতা নিয়ে প্রকাশ্যে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। দলটির নেতারা নির্বাচন অংশগ্রহণ নিয়ে দ্বিধার কথাও বলছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের বক্তব্য ভোটারদের আস্থাকে দুর্বল করে এবং ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

নির্বাচন বানচালের নেপথ্য ছক : গোয়েন্দা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একটি অংশ সরাসরি রাজপথে সক্রিয় না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়েছে। টেলিগ্রাম ও অন্যান্য এনক্রিপটেড প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত অনলাইন বৈঠকের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। গোপালগঞ্জ, খুলনা, কুষ্টিয়া, গাজীপুরসহ কয়েকটি জেলায় পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা চালানো হতে পারে- এমন সতর্কতাও এসেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। একই সাথে বিদেশী মহলে লবিং করে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অপচেষ্টার কথাও উঠে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজিরবিহীন প্রস্তুতি : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক লাখ সদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেসি মতা নিয়ে মাঠে থাকবেন। ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।

পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি মিলিয়ে থাকবে প্রায় সাত লাখের বেশি সদস্য। বিজিবি, র‌্যাব, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য বাহিনীও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা বলয় : প্রথমবারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে ২৫ হাজার ৫০০ বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে লাইভ স্ট্রিমিং ও জরুরি এসওএস পাঠানো যাবে। প্রায় ৫০০ ড্রোন ও ৫০টি ডগ স্কোয়াড দিয়ে নজরদারি চালানো হবে। ‘নির্বাচন সুরা অ্যাপ্লিকেশন’-এর মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে।

পাহাড় ও দুর্গম এলাকায় বাড়তি নজর : পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নদীবেষ্টিত দুর্গম এলাকাগুলোতে নির্বাচনী সরঞ্জাম পরিবহন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী বিশেষ দায়িত্ব পালন করবে। পাহাড়ে গুজব ছড়িয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা চলছে বলেও গোয়েন্দা সতর্কতায় উল্লেখ রয়েছে।

বস্তি ও অপরাধপ্রবণ এলাকা- সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে নগর বস্তি ও অপরাধপ্রবণ এলাকা। এখানে মাদক নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নির্বাচনের আগেই সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে এসব এলাকায় অপরাধী গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে- এমন ধারণা থেকেই এখনই শক্তি প্রদর্শন শুরু হয়েছে।

সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি ভোট নয়- এটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাস ও রাষ্ট্রীয় সমতার বড় পরীা। নির্বাচন বানচালের আশঙ্কা ও ষড়যন্ত্র যতই থাকুক, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান পরিষ্কার- নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন হবে এবং যেকোনো অস্থিতিশীলতার চেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে। এখন প্রশ্ন একটাই- এই বিপুল নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা কি শেষ পর্যন্ত ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে?